
আজকাল একটি প্রবণতা অনেক বেশি লক্ষ করা যাচ্ছে যে মানুষ কোনো অন্যায় কাজ হতে দেখেও নির্লিপ্ত থাকে। অনেক নামাজি দ্বিনদার মানুষও এটা মনে করে চুপ থাকে যে এটি তার ব্যক্তিগত বিষয়, তাতে হস্তক্ষেপ করা যাবে না। দ্বিনদার মানুষরাও আজ এতই লিবারেল সেজে বসেছে যে অন্যায় কাজে বাধা দেওয়াকে স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ মনে করে বিরত থাকছে। অনেকে বলে, নিজে ভালো তো সব ভালো।
আসলে বিষয়টি কি এমন? মানুষ সামাজিক জীব। সমাজের ভালো-খারাপের প্রভাব সবার ওপরই পড়ে থাকে। তাই এই চিন্তা সম্পূর্ণ অসার যে আমি ভালো হলেই সব ভালো। না, বরং আজ যদি আমি অন্যায় কাজে বাধা না দিই, আল্লাহ না করুন! এর কুপ্রভাব আমার ঘরে এসে পৌঁছবে।
তখন আমার নিজের সততা আমাকে কাজে দেবে না। হাদিস শরিফে বিষয়টিকে দ্বিতলবিশিষ্ট একটি জাহাজের সঙ্গে তুলনা দিয়ে বোঝানো হয়েছে। নিচতলার আরোহীরা বোকামিবশত যদি জাহাজের তলা ছিদ্র করতে শুরু করে, আর দোতলার আরোহীরা যদি তাদের বাধা না দেয়, তাহলে সবাই ডুবে মরবে। এ জন্যই ইসলাম সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজে বাধা প্রদান গুরুত্বপূর্ণ ফরজ সাব্যস্ত করেছে।
অন্যায় দেখে নির্লিপ্ততা মুমিনের আচরণ নয়
হাদিস শরিফে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি কোনো গর্হিত কাজ হতে দেখবে সে যদি নিজ হাত দ্বারা তা প্রতিহত করতে সক্ষম হয় সে যেন তা করে। আর যদি তাতে সক্ষম না হয় তাহলে মুখের দ্বারা প্রতিবাদ করবে। আর যদি (প্রতিকূল পরিবেশে) তাতেও সক্ষম না হয় তাহলে অন্তরে ঘৃণা করবে। আর এটি হলো ঈমানের সর্বনিম্ন স্তর। (মুসলিম, হাদিস : ৪৯)
কোনো কোনো ব্যাখ্যাকার বলেন, অন্তরে শুধু ঘৃণাই যথেষ্ট নয়, বরং মনে মনে এ বিষয়ে অস্থিরতা থাকতে হবে এবং অন্যায় কাজটি রুখে দেওয়ার সুপরিকল্পনা নিয়ে ভাবতে হবে।এতে আল্লাহ তাআলা হয়তো কোনো সুপথ খুলে দেবেন।
হাদিস শরিফের বর্ণনায় আগের যুগে একটি জনপদকে আল্লাহ তাআলা ধ্বংস করার জন্য ফেরেশতাদের নির্দেশ দিলে ফেরেশতারা বললেন, সেখানে একজন নেককার লোক আছে। তখন আল্লাহ বললেন, তাকে সহ ধ্বংস করো, কেননা এত সব অন্যায় আচরণ দেখেও সে সামান্যতম ভ্রুকুঞ্চিত করেনি। (আলমুজামুল আওসাত : হাদিস ৭৬৬১)
গুনাহে বাধা না দিলে আল্লাহর অভিশাপ আসে
ইবনে মাসউদ (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, তোমাদের পূর্ববর্তীদের মধ্যে যখন কেউ কোনো গুনাহের কাজ করত, তখন কোনো বারণকারী তাকে ওই কাজ থেকে বারণ করত। কিন্তু পরদিনই সে আবার ওই গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তির সঙ্গে ওঠাবসা, খানাপিনা করা আরম্ভ করত, যেন সে তাকে গতকাল গুনাহে লিপ্ত দেখেনি। আল্লাহ তাআলা তাদের এ আচরণের কারণে তাদের অন্তরকে পরস্পরে মিলিয়ে দেন এবং তাদেরকে তাদের নবী দাউদ ও ঈসা (আ.)-এর জবানে অভিশপ্ত করেন, আর এটি তাদের নাফরমানি ও সীমা লঙ্ঘনের কারণেই। ওই সত্তার কসম, যাঁর হাতে মুহাম্মদের প্রাণ! তোমরা অবশ্যই সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ করবে এবং অন্যায়কারীর হাত টেনে ধরবে, নচেৎ আল্লাহ তাআলা তোমাদের পরস্পরের অন্তরকে মিলিয়ে দেবেন, অতঃপর তোমাদের ওপরও অনুরূপ অভিশাপ করা হবে, যেরূপ তারা অভিশপ্ত হয়েছিল।
(সুনানে আবি দাউদ, হাদিস : ৪৩৩৬)
অপর বর্ণনায় রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, যে গোত্রের মধ্যে প্রতাপ ও দাপটের সঙ্গে এমন ব্যাপকভাবে গুনাহ হতে থাকে যে তারা তা পরিবর্তন করে না, অবশ্যই আল্লাহ তাআলা তাদেরকে ব্যাপকভাবে আজাবে নিপতিত করবেন।
(সুনানে আবি দাউদ, হাদিস : ৪৩৩৯)
অন্যায় কাজে প্রশ্রয় দিলে দোয়া কবুল হয় না
একটি হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, অবশ্যই তোমরা সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করো, নচেৎ আল্লাহ তাআলা তোমাদের ওপর তোমাদের মধ্যে সর্বনিকৃষ্ট লোকদের চাপিয়ে দেবেন; ফলে তোমাদেরকে নিকৃষ্টতম আজাবে নিপতিত করা হবে। অতঃপর সৎ লোকেরা তোমাদের জন্য দোয়া করবে, তবে তা কবুল করা হবে না। অবশ্যই তোমরা সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করো, নচেৎ আল্লাহ তাআলা তোমাদের ওপর এমন লোকদের চাপিয়ে দেবেন যে তোমাদের ছোটদের দয়া করবে না এবং বড়দের সম্মান করবে না। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ২১৬৯)
অপর হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, যখন আমার উম্মত জালিমকে তার মুখোমুখি জালিম বলতে ভয় করবে, তাদের থেকে আল্লাহর সাহায্য উঠে যাবে।