Islamic News BD - The Lesson of Peace
আদিনা মসজিদ ৬৫০ বছরের আদিনা মসজিদকে ‘মন্দির’ দাবি হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের
রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬ ১৭:১৮ অপরাহ্ন
Islamic News BD - The Lesson of Peace

Islamic News BD - The Lesson of Peace

পশ্চিমবঙ্গের মালদা জেলার ঐতিহাসিক ৬৫০ বছরের প্রাচীন আদিনা মসজিদের বাইরে এক বিশাল শিবলিঙ্গ স্থাপনের ঘোষণা দিয়েছে একটি হিন্দুত্ববাদী সংগঠন। তাদের দাবি, আদিনা মসজিদটি আসলে একটি প্রাচীন ‘আদিনাথ শিব মন্দির’-এর ধ্বংসাবশেষের ওপর গড়ে উঠেছে। আগামী সোমবার সেখানে পুজো ও ‘রুদ্র বিশেষ’ যজ্ঞেরও আয়োজন করা হয়েছে।


উত্তরবঙ্গ বিজেপির ‘সুশাসন সেলে’র আহ্বায়ক এবং ‘আদিনাথ পুরাতন শিব মন্দির’ সংগঠনের প্রধান পৃষ্ঠপোষক কাজল গোস্বামী সম্প্রতি ফেসবুকে একটি পোস্টের মাধ্যমে এই কর্মসূচি ঘোষণা করেন। তিনি হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের (সনাতনী) শ্রাবণ মাসের দ্বিতীয় সোমবারে তথাকথিত এই ‘প্রাচীন আদিনাথ শিব মন্দিরে’ উপস্থিত হওয়ার আহ্বান জানান।


কাজল গোস্বামী দাবি করেছেন, যে স্থানে শিবলিঙ্গটি বসানো হবে, তা ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ (এএসআই)-এর সংরক্ষিত এলাকার বাইরে অবস্থিত। এছাড়া তার দাবি, স্থানীয় মন্দির প্রশাসন তারকেশ্বর থেকে আনা এই ৩.৬ ফুট উচ্চতার এবং দেড় টন ওজনের বিশাল শিবলিঙ্গটি স্থাপনের অনুমতি দিয়েছে।

তিনি আশাপ্রকাশ করে বলেন, “আদালতের রায় এবং এএসআই-এর নতুন সমীক্ষার মাধ্যমে খুব শীঘ্রই এই স্থানের প্রকৃত ইতিহাস প্রকাশ্যে আসবে।” কাজল গোস্বামীর অভিযোগ, আদিনাথ মন্দির ধ্বংস করেই আদিনা মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছিল। তিনি বলেন, “তথাকথিত এই মসজিদের ভেতরে বহু হিন্দু ও বৌদ্ধ দেবদেবীর মূর্তি ও প্রতীক রয়েছে।”

তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য সম্পর্কে তিনি জানান, মূল লক্ষ্য হলো মন্দিরটি পুনরুদ্ধার করা এবং পরবর্তীতে মসজিদের ভেতরেই শিবলিঙ্গটি স্থাপন করা। তবে তারা আইনের মধ্যে থেকেই পদক্ষেপ নেবেন বলে দাবি করেন। তিনি জানান, ইতোমধ্যে পুলিশ ও এএসআই কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের কথা হয়েছে এবং প্রশাসনিক নির্দেশ অনুযায়ী সব ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান শুধু সংরক্ষিত এলাকার বাইরেই পালন করা হবে।

‘আদিনাথ পুরাতন শিব মন্দির’ নামের ওই সংগঠনটির দাবি, মসজিদটিতে হিন্দু ও বৌদ্ধ স্থাপত্যের পাশাপাশি একটি শিবলিঙ্গও রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে শিগগিরই তারা এএসআই-এর বিস্তারিত রিপোর্টের দাবিতে কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হবেন।

.এদিকে, সম্ভাব্য উত্তেজনা এড়াতে গত ১৫ জুলাই মালদা জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে একটি বিশেষ সতর্কবার্তা বা নির্দেশিকা জারি করা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আদিনা মসজিদে গিয়ে পুজো দেওয়ার ঘোষণার পর পুলিশ স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, আদিনা মসজিদ ১৯৫৮ সালের ‘প্রাচীন স্মৃতিসৌধ ও প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান সুরক্ষা আইন’-এর অধীনে একটি সংরক্ষিত জাতীয় স্মারক। এই সংরক্ষিত এলাকায় কোনো প্রকার ধর্মীয় আচার বা অনুমোদনহীন কার্যক্রম সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তবে বিষয়টি নিয়ে রাজনীতির পারদ ক্রমেই চড়ছে। শুক্রবার ভারতের সংসদে বক্তব্য রাখার সময় বিজেপি বিধায়ক তরুণজ্যোতি তিওয়ারি দাবি করেন, তিনি সম্প্রতি মালদায় আদিনা মসজিদ দেখতে গিয়েছিলেন, কিন্তু সেখানে গিয়ে তার মনে হয়েছে সেটি কোনো মসজিদ নয়, বরং একটি ধ্বংসাবশেষ। তিনি বলেন, “সেখানকার প্রতিটি পাথর যেন চিৎকার করে বলছিল—‘আমিই আদিনাথ মন্দির’।” ঘটনাটিকে ইতিহাসের এক ‘বেদনাদায়ক অধ্যায়’ বলে বর্ণনা করে তিনি বলেন, “মনে হচ্ছে ভগবান মহাদেব এখনও তার প্রাচীন আবাস পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন। ইতিহাস প্রমাণের ওপর ভিত্তি করা উচিত, সময়ের গর্ভে হারিয়ে যাওয়া উচিত নয়।”



উল্লেখ্য, ১৩৭৩ খ্রিস্টাব্দে বেঙ্গল সালতানাতের সুলতান সিকান্দার শাহ এই সুবিশাল আদিনা মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন। এটি ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ (এএসআই)-এর তালিকাভুক্ত একটি জাতীয় গুরুত্বসম্পন্ন স্মৃতিসৌধ এবং ভারতীয় উপমহাদেশের মধ্যযুগীয় বৃহত্তম মসজিদগুলোর অন্যতম।

তবে ২০২২ সালে বিজেপি নেতা রথীন্দ্র বসু সামাজিক মাধ্যমে দাবি করেছিলেন যে, “আদিনা মসজিদের নিচে আদিনাথ মন্দির ঘুমিয়ে আছে।” একই সুরে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের (ভিএইচপি) নেতারাও মসজিদটির কারুকার্য পর্যবেক্ষণ করে এটিকে প্রাক-ইসলামিক যুগের স্থাপত্য বলে দাবি তোলেন।


পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে হিরণ্ময় গোস্বামী নামে এক হিন্দু পুরোহিতের নেতৃত্বে একটি দল বেআইনিভাবে সুরক্ষিত আদিনা মসজিদে প্রবেশ করে শিবলিঙ্গ ও মূর্তি রয়েছে দাবি করে ধর্মীয় আচার সম্পন্ন করে। এই ঘটনার প্রতিবাদে স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে এবং পরবর্তীতে অনুমতি ছাড়া সুরক্ষিত স্থানে প্রবেশ ও ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগে এএসআই-এর পক্ষ থেকে হিরণ্ময় গোস্বামীর বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করা হয়।


সম্প্রতি ২০২৫ সালের অক্টোবরে তৃণমূল কংগ্রেসের সংসদ সদস্য ইউসুফ পাঠান আদিনা মসজিদ পরিদর্শনের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করে এটিকে ১৪ শতকের সুলতান সিকান্দার শাহের নির্মিত একটি ঐতিহ্যবাহী স্থান বলে উল্লেখ করলে বিতর্ক নতুন করে দানা বাঁধে। পশ্চিমবঙ্গ বিজেপি এর জবাবে লিখেছিল, “সংশোধনী: এটি আদিনাথ মন্দির।”

এরপর ২০২৫ সালের ৫ ডিসেম্বর ভারতের রাজ্যসভায় বিষয়টি প্রথম জোরেশোরে তুলে ধরেন রাজ্যসভার বিজেপি সংসদ সদস্য ও পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির তৎকালীন সভাপতি শমিক ভট্টাচার্য। তিনি অভিযোগ করেন, আদিনা মসজিদটি প্রাচীন হিন্দু ও বৌদ্ধ স্থাপত্য ভেঙে তার উপাদান দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল এবং মূল স্থানে শিব ও বিষ্ণুর আদিনাথ মন্দির ছিল। তিনি কেন্দ্র সরকার ও এএসআই-কে অবিলম্বে বিষয়টি তদন্তের অনুরোধ জানান।
অন্যদিকে, বিজেপির আরেক রাজ্যসভা সদস্য ও পশ্চিমবঙ্গের সাবেক বিজেপি সভাপতি রাহুল সিনহা এই বিতর্ককে সরাসরি অযোধ্যার 'রাম জন্মভূমি-বাবরি মসজিদ' ঘটনার সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি দাবি করেন, “রাম মন্দির ও অন্যান্য প্রাচীন মন্দিরের মতো এটিকেও ধ্বংস করে মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছিল। ভক্তদের ধর্মীয় অনুভূতিকে এভাবে অস্বীকার করা সম্ভব নয়।”