
যখন কারও সাথে আমাদের সম্পর্ক ভালো থাকে, তখন তো আমাদের আচরণ সাধারণত ভালোই থাকে। কিন্তু যখনই সম্পর্কের অবনতি ঘটে, কেউ কষ্ট দেয় কিংবা পারস্পরিক দূরত্ব সৃষ্টি হয়, তখন আমরা কেমন প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছি, আমরা কীভাবে সেই পরিস্থিতি সামাল দিচ্ছি, আমাদের আচার-আচরণ তার মতোই প্রতিশোধপরায়ণ হচ্ছে নাকি আমরা ভালো থাকার চেষ্টা করে ধৈর্য ধারণ করছি, সেটাই আসল বিষয়।পৃথিবীতে এ জাতীয় পারস্পরিক জটিলতা ও তিক্ত সম্পর্ক থেকে কারোরই দূরে থাকার উপায় নেই। আল্লাহ তাআলা সবাইকে এই পরীক্ষার মুখোমুখি করবেন। জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত বা সব সম্পর্ক কখনোই সমান সুন্দর থাকে না। দাম্পত্য জীবন থেকে শুরু করে ভাই-বোন ও আত্মীয়-স্বজনের সাথে সম্পর্কের টানাপোড়েন বা ওঠানামা হওয়া অত্যন্ত স্বাভাবিক। ভালোবাসা ও মায়ামমতার পাশাপাশি মাঝেমধ্যে কিছুটা দূরত্ব তৈরি হওয়া কিংবা রাগ-অভিমান হওয়া বিচিত্র কিছু নয়। তবে এই সংবেদনশীল মুহূর্তে কে সুন্দরভাবে পরিস্থিতি সামাল দেয়, কে উত্তরণের চেষ্টা করে আর কে মূর্খতার পরিচয় দেয়, সেটাই মানুষের জীবনের বড় আমল হিসেবে পরিগণিত হয়।
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে স্পষ্ট ঘোষণা করেছেন, মানুষকে তিনি কেবল একতরফা শান্তিতে দিনাতিপাত করার জন্য সৃষ্টি করেননি, বরং পরীক্ষা করার জন্য সৃষ্টি করেছেন যে, কার আমল কতটা সুন্দর। আর আমল মানে কেবল নামাজ, রোজা, হজ বা জাকাত নয়। একে অপরের সাথে আমাদের ব্যবহার, লেনদেন কিংবা পারস্পরিক রাগ-ক্ষোভের মুহূর্তে আমাদের ভূমিকাও আমলের অন্তর্ভুক্ত। কষ্ট পেলে আমরা কি ধৈর্য ধারণ করি, নাকি অস্থির হয়ে গালিগালাজ ও ঝগড়াঝাঁটিতে লিপ্ত হই এগুলোও আমলনামায় লিপিবদ্ধ হচ্ছে।কাউকে কষ্ট না দেওয়া, কষ্ট পেলে তা হজম করা, অন্যায়ের মুখে চুপ থাকা এবং মাফ করে দেওয়ার অভ্যাস নেকির পাল্লাকে অনেক ভারী করে দেয়। হাদিস শরিফে বর্ণিত হয়েছে, কেয়ামতের দিন নেকির পাল্লায় এই সৎ চরিত্র ও সুন্দর আচরণই সবচেয়ে বেশি ওজনদার হবে। ঠিক এর বিপরীতটা ঘটলে, অর্থাৎ আমরা যদি কটুভাষী হই, দুর্ব্যবহার করি, কথার আঘাতে মানুষকে ক্ষতবিক্ষত করি তবে তা আমলনামাকে কলঙ্কিত করবে এবং গুনাহের পাল্লাকে ভারী করে তুলবে।
পবিত্র কোরআন ও হাদিসে এই সুন্দর চারিত্রিক গুণাবলী অর্জনের জোরালো তাগিদ দেওয়া হয়েছে। পারস্পরিক লেনদেন, দাম্পত্য জীবন ও পারিবারিক সম্পর্কের টানাপোড়েনে ক্ষমার সংস্কৃতি গড়ে তোলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা তওবা ও ক্ষমার দিকে ধাবিত হয়ে সেই জান্নাত অর্জনের আহ্বান জানিয়েছেন, যার ব্যাপ্তি আসমান ও জমিনব্যাপী এবং যা মুত্তাকিদের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে। মুত্তাকিদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, তারা সচ্ছল ও অসচ্ছল উভয় অবস্থায় দান-সদকা করে, নিজেদের ক্রোধ সংবরণ করে এবং মানুষের অপরাধ ক্ষমা করে দেয়। বিচার-সালিশ বা তর্ক-বিতর্ক নিয়ে অস্থির না হয়ে মাফ করে দেওয়ার এই মেজাজকেই আল্লাহ তাআলা সবচেয়ে বেশি পছন্দ করেন।অন্য এক আয়াতে আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন, যখন কেউ মন্দ আচরণ করে, তখন তার প্রতিদানে মন্দ না বলে বরং উত্তম আচরণ দিয়ে তা প্রতিহত করতে। একতরফা ভালো ব্যবহার চালিয়ে গেলে একদিন হয়তো দেখা যাবে, যে ব্যক্তি পূর্বে শত্রুতা বা দুর্ব্যবহার করত, সে-ই একসময় লজ্জিত হয়ে পরম বন্ধু ও আপনজনে পরিণত হয়েছে। অথচ আমাদের সাধারণ প্রবণতা হলো উচিত শিক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করা। কিন্তু প্রতিশোধের মাধ্যমে উচিত শিক্ষা দিতে গিয়ে পরিস্থিতি কেবল আরও অবনতির দিকেই যায়। প্রকৃতপক্ষে প্রকৃত উচিত শিক্ষা হলো ধৈর্য ধারণ করে থাকা; একদিন না একদিন অপরাধী নিজের ভুল বুঝতে পেরে লজ্জিত হবেই।হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, যখন কেউ দুর্ব্যবহার করে, তখন তার সাথে সৎ ব্যবহার করা উচিত; অন্তত নিজের রাগ সংবরণ করে ক্ষমা করে দেওয়া উচিত। কেউ মূর্খতাবশত মন্দ আচরণ করলে শান্তির বার্তা বাসালাম জানিয়ে সেখান থেকে প্রস্থান করাই মুমিনের পরিচয়। অবশ্য এই অসাধারণ গুণটি কেবল তারাই অর্জন করতে পারে, যাদের আল্লাহ তাআলা ধৈর্য বা সবর দান করেছেন। বৈরী পরিস্থিতিতে যারা সবর করে, তারাই সৌভাগ্যবান।
অনেক সময় ধৈর্য ধরার পরও দেখা যায় অপরপক্ষ থামছে না, বরং বারংবার সীমালঙ্ঘন করে যাচ্ছে। তখন মনে হতে পারে, কতবার ধৈর্য ধরা যায়? কিন্তু মূল বিষয় হলো, বান্দা যখন সবর করতে চায়, শয়তান তখন তাকে প্ররোচিত করে। শয়তান হৃদয়ে ক্রোধ উসকে দিয়ে পুরনো স্মৃতি বা অপমান মনে করিয়ে দেয় এবং প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য তাগিদ দিতে থাকে। এমন কি অতীত ইতিহাস বা গোপন বিষয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফাঁস করে দেওয়ার মতো কুপ্রবৃত্তি জাগিয়ে তোলে। এই জাতীয় ওয়াসওয়াসা বা শয়তানি প্ররোচনা থেকে রক্ষা পেতে আল্লাহর কাছে পানাহ চাইতে হবে। আল্লাহ তাআলা সবকিছু শোনেন ও দেখেন; কার অন্তরে কী ষড়যন্ত্র বা কষ্ট রয়েছে তা তিনি সম্যক অবগত।আল্লাহ তাআলা মানুষকে ক্ষমা করার ব্যাপারে বারবার উৎসাহিত করেছেন এবং বিনিময়ে বান্দাকে মাফ করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। যে ব্যক্তি মানুষকে ক্ষমা করতে পারে না, সে আখেরাতেও আল্লাহর বিশেষ ক্ষমা থেকে বঞ্চিত হতে পারে। অন্যদিকে, যে ব্যক্তি ক্ষমা করে সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে, তার জন্য আল্লাহর কাছে অসীম পুরস্কার সংরক্ষিত থাকে।রাসুলুল্লাহকে (সা.) জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, কোন আমল মানুষকে বেশি জান্নাতে নিয়ে যাবে? তিনি উত্তরে বলেছিলেন, আল্লাহর ভয় ও সুন্দর আচরণ। কেয়ামতের দিন সেইসব মানুষই রাসুলুল্লাহর (সা.) সবচেয়ে কাছাকাছি স্থান পাবে, যারা পৃথিবীতে প্রতিকূল পরিস্থিতিকে সুন্দর ও ইতিবাচকভাবে মোকাবিলা করতে পেরেছে। জীবনে চলার পথে আমাদের সামনেও এমন বহু কঠিন পরিস্থিতি আসবে, আল্লাহ তাআলা যেন আমাদের সেসব পরিস্থিতি ইতিবাচকভাবে সামাল দেওয়ার এবং চারিত্রিক সৌন্দর্যের মাধ্যমে সম্পর্কগুলো সুদৃঢ় রাখার তাওফিক দান করেন।