Islamic News BD - The Lesson of Peace
নিয়ন্ত্রিত নফস মানুষকে আল্লাহর অনুগত বান্দায় পরিণত করে
শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৯:১১ অপরাহ্ন
Islamic News BD - The Lesson of Peace

Islamic News BD - The Lesson of Peace

মানুষের জীবনে সবচেয়ে কঠিন নিয়ন্ত্রণটি অনেক সময় অন্য কাউকে নয়, নিজেকেই করতে হয়। বাইরে থেকে মানুষ যতই শান্ত, ভদ্র ও সংযমী মনে হোক, তার ভেতরে প্রতিনিয়ত চলতে থাকে নানা চাওয়া-পাওয়া, রাগ, লোভ, অহংকার, কামনা ও প্রবৃত্তির টানাপড়েন।

মন চায় এক কথা, বিবেক বলে আরেক কথা; নফস চায় তৎক্ষণাৎ তৃপ্তি, আর ঈমান শেখায়—আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কিছু ইচ্ছাকে থামিয়ে দিতে। তাই ইসলাম নফসকে পরিশুদ্ধ ও নিয়ন্ত্রিত করতে শিখিয়েছে। কারণ লাগামহীন নফস মানুষকে প্রবৃত্তির দাসে পরিণত করে, আর নিয়ন্ত্রিত নফস মানুষকে আল্লাহর অনুগত বান্দায় পরিণত করে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই সে সফল হয়েছে, যে নিজ আত্মাকে পরিশুদ্ধ করেছে।

আর সে ব্যর্থ হয়েছে, যে তাকে কলুষিত করেছে।’ (সুরা : শামস, আয়াত : ৯-১০)

নফসকে নিয়ন্ত্রণ করা কেন জরুরি

আল্লাহ তাআলা মানুষের মধ্যে ভালো-মন্দের প্রবণতা রেখেছেন। নফস যদি ঈমান, তাকওয়া ও বিবেকের নিয়ন্ত্রণে থাকে, তাহলে মানুষ নিজের প্রবৃত্তিকে কল্যাণের পথে পরিচালিত করতে পারে। কিন্তু নফস যখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তখন মানুষ নিজের ইচ্ছাকেই সত্যের মানদণ্ড বানিয়ে ফেলে।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই নফস তো মন্দ কাজের প্রতি প্রবলভাবে নির্দেশ দেয়, তবে আমার প্রতিপালক যার প্রতি দয়া করেন সে ছাড়া।’ (সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ৫৩)

নিম্নে নফসকে কন্ট্রোল করার ১০ টি উপায় তোলে ধরা হলো :

১. আল্লাহর ভয় ও তাকওয়া অর্জন করা : নফস নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে শক্তিশালী উপায় হলো অন্তরে আল্লাহর ভয় ও তাঁর প্রতি গভীর সচেতনতা সৃষ্টি করা। মানুষ যখন মনে রাখে—আমি যা করছি আল্লাহ তা দেখছেন—তখন গোপন পাপ থেকেও নিজেকে বিরত রাখা সহজ হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর যে ব্যক্তি তার প্রতিপালকের সামনে দাঁড়ানোর ভয় রাখে এবং নিজেকে প্রবৃত্তির অনুসরণ থেকে বিরত রাখে, নিশ্চয়ই জান্নাতই হবে তার আশ্রয়।’ (সুরা : নাজিআত, আয়াত : ৪০-৪১)

২. ফরজ ইবাদত ঠিক করা : নফসকে নিয়ন্ত্রণের প্রশিক্ষণ শুরু হয় ফরজ ইবাদত থেকে।

বিশেষ করে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ মানুষকে নিয়ম-শৃঙ্খলা ও আল্লাহর স্মরণের মধ্যে রাখে। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই নামাজ অশ্লীলতা ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে।’ (সুরা : আনকাবুত, আয়াত : ৪৫)

৩. রোজার মাধ্যমে প্রবৃত্তিকে প্রশিক্ষিত করা : রোজা নফস নিয়ন্ত্রণের অন্যতম কার্যকর প্রশিক্ষণ। ক্ষুধা লাগলেও মানুষ খায় না, তৃষ্ণা পেলেও পানি পান করে না—কারণ আল্লাহর নির্দেশ তাকে নিয়ন্ত্রণ করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) যুবকদের উদ্দেশে বলেছেন, ‘হে যুবসমাজ! তোমাদের মধ্যে যে বিবাহের সামর্থ্য রাখে, সে যেন বিবাহ করে... আর যে সামর্থ্য রাখে না, সে যেন রোজা রাখে। কারণ তা তার জন্য ঢালস্বরূপ।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫০৬৬)

৪. নিজের কামনা-বাসনার বিরুদ্ধে ‘না’ বলতে শেখা : নফসকে নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুশীলন হলো—সব ইচ্ছা পূরণ না করা। মন চাইলেই সবকিছু করা যাবে—এ ধারণা পরিত্যাগ করতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘শক্তিশালী সে নয়, যে কুস্তিতে অন্যকে পরাজিত করে; বরং প্রকৃত শক্তিশালী সে, যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬১১৪)

৫. রাগ নিয়ন্ত্রণ করা : রাগ নফসের অন্যতম প্রবল প্রকাশ। রাগের মুহূর্তে মানুষ এমন কথা বলে বা কাজ করে বসে, যার জন্য পরে অনুতপ্ত হতে হয়। এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এসে বললেন, ‘আমাকে উপদেশ দিন।’ তিনি বললেন, ‘রাগ করো না।’ লোকটি বারবার উপদেশ চাইলে রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রতিবারই বললেন, ‘রাগ করো না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬১১৬)

৬. চোখ ও কানের হেফাজত করা : নফসকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইলে তার খাদ্য বন্ধ করতে হবে। হারাম দৃশ্য, অশ্লীলতা, পরনিন্দা, অশালীন কথা ও পাপের পরিবেশ নফসকে দুর্বল করে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘মুমিনদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত করে এবং নিজেদের লজ্জাস্থান হেফাজত করে।’ (সুরা : নুর, আয়াত : ৩০)

৭. বেশি বেশি জিকির করা : নফস যখন আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে থাকে, তখন প্রবৃত্তি ও শয়তানের প্ররোচনা প্রবল হতে পারে। তাই আল্লাহর জিকির অন্তরকে জীবিত রাখে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়।’ (সুরা : রাদ, আয়াত : ২৮)

৮. নিজের হিসাব নিজে নেওয়া : প্রতিদিন নিজেকে প্রশ্ন করা দরকার—আজ আমি কী বলেছি? কী দেখেছি? কার হক নষ্ট করেছি? কোথায় রাগ করেছি? কোন গুনাহ করেছি? কোন নেক আমল করতে পারিনি? আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং প্রত্যেক ব্যক্তি যেন দেখে, সে আগামী দিনের জন্য কী পাঠিয়েছে।’ (সুরা : হাশর, আয়াত : ১৮)

৯. সৎ মানুষের সঙ্গ গ্রহণ করা : মানুষ তার সঙ্গীদের দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়। তাই নফসকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইলে আল্লাহভীরু, সৎ ও নেককার মানুষের সঙ্গ গ্রহণ করা প্রয়োজন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সৎ সঙ্গী ও অসৎ সঙ্গীর দৃষ্টান্ত হলো সুগন্ধি বিক্রেতা ও কামারের হাপরের মতো।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২১০১; সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৬২৮)

১০. দুনিয়ার মোহ কমিয়ে আখিরাতকে লক্ষ্য বানোনো : নফস সাধারণত তাৎক্ষণিক আনন্দ চায়; কিন্তু মুমিন ভবিষ্যৎ—অর্থাৎ আখিরাতের স্থায়ী জীবনের কথা চিন্তা করে। আল্লাহ বলেন, ‘অথচ আখিরাতই উত্তম এবং অধিক স্থায়ী।’ (সুরা : আলা, আয়াত : ১৭)