
মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) আরবের মক্কা নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন এবং তাঁর নবুয়তের সূচনায় মক্কার মানুষ ও আরব সম্প্রদায়ই তাঁর প্রধান শ্রোতা ছিল। ফলে তাদের কাছে আল্লাহর বাণী স্পষ্টভাবে পৌঁছে দেওয়ার জন্য তাদের পরিচিত ভাষা আরবিতেই কোরআন নাজিল হওয়া ছিল স্বাভাবিক ও যুক্তিসঙ্গত। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি প্রত্যেক রাসুলকে তার সম্প্রদায়ের ভাষাতেই পাঠিয়েছি, যাতে সে তাদের কাছে (আল্লাহর বাণী) স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে।’ (সুরা : ইবরাহিম, আয়াত : ৪)
আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত রাসুলরা যুগে যুগে স্বজাতির কাছে এমন ভাষায় বাণী পৌঁছে দিয়েছেন, যা তারা সহজে বুঝতে পারে। কারণ দাওয়াতের প্রথম শর্তই হলো, মানুষকে তার বোধগম্য ভাষায় সত্যের আহ্বান জানানো। এ কারণেই মহানবী (সা.)-এর ওপর কোরআন আরবি ভাষায় নাজিল হয়েছে। আরবি ছিল তাঁর জাতির ভাষা, তাঁর সমাজের ভাষা এবং তাঁর প্রথম শ্রোতাদের ভাষা। কোরআন নিজেই আরবি ভাষা নির্বাচনের অন্যতম কারণ উল্লেখ করেছে। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমি এটিকে আরবি কোরআন করেছি, যাতে তোমরা বুঝতে পারো।’ (সুরা : জুখরুফ, আয়াত : ৩)
কোরআনের ভাষা আরবি হওয়ার সঙ্গে মানুষের বোঝার বিষয়টি সরাসরি সম্পৃক্ত। যে জাতির কাছে প্রথমে কোরআনের বাণী পৌঁছানো হচ্ছিল, তাদের ভাষায় কোরআন নাজিল হওয়ায় তারা এর আয়াত শুনতে, বুঝতে, চিন্তা করতে এবং তার আলোকে নিজেদের জীবন পরিবর্তন করতে সক্ষম হয়েছে। কোরআন যদি তাদের অপরিচিত কোনো ভাষায় নাজিল হতো, তাহলে তারা এর বক্তব্য বোঝার আগেই ভাষাগত প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতো। ফলে আল্লাহর বাণী মানুষের হৃদয়ে পৌঁছানোর যে উদ্দেশ্য, তা ব্যাহত হতে পারত।
কোরআনের নাজিলের প্রাথমিক পর্যায়ে মক্কা ও তার আশপাশের মানুষকে তাওহিদ, আখিরাত ও আল্লাহর আনুগত্যের দিকে আহ্বান করা এবং অবিশ্বাস ও শিরকের পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করা ছিল গুরুত্বপূর্ণ একটি দায়িত্ব। মহান আল্লাহ বলেন, ‘এভাবেই আমি তোমার প্রতি আরবি কোরআন ওহি করেছি, যাতে তুমি উম্মুল কুরা (মক্কা) ও তার আশপাশের লোকদের সতর্ক করতে পারো। ’ (সুরা : শুরা, আয়াত : ৭)
মহানবী (সা.)-এর দাওয়াতের প্রথম পরিসর ছিল মক্কা ও তার আশপাশ। তাই তাদের বোধগম্য ভাষায় আল্লাহর বাণী নাজিল হওয়া ছিল দাওয়াতের স্বাভাবিক ও কার্যকর পদ্ধতি। তবে এর অর্থ এই নয় যে কোরআনের বার্তা শুধু আরবদের জন্য। কোরআন সমগ্র মানবজাতির জন্য হিদায়াত। আল্লাহ বলেন, ‘(এটি) বিশ্বজগতের জন্য হিদায়াত।’»
কোরআনের ভাষা আরবি হলেও এর শিক্ষা, আদেশ, নিষেধ, নৈতিকতা ও হিদায়াতের আবেদন কোনো নির্দিষ্ট জাতি বা ভূখণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
অনারবি হলে কী আপত্তি উঠত
মহান আল্লাহ কোরআন আরবি ভাষায় নাজিল করার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক কোরআনের অন্য একটি আয়াতে তুলে ধরেছেন। আল্লাহ বলেন, ‘যদি আমি এটিকে অনারবি কোরআন করতাম, তবে তারা অবশ্যই বলত, ‘এর আয়াতগুলো সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হলো না কেন? (কিতাব) অনারবি আর (রাসুল) আরবি!’ (সুরা : ফুসসিলাত, আয়াত : ৪৪)
এখানে মক্কার অবিশ্বাসীদের সম্ভাব্য আপত্তির একটি চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। তারা যদি এমন কোনো কিতাব পেত, যার ভাষা তাদের কাছে অপরিচিত, তাহলে তারা কোরআনের বিষয়বস্তুর পরিবর্তে ভাষাকে কেন্দ্র করে আপত্তি তোলার সুযোগ পেত।
আরবি ভাষা তার শব্দভাণ্ডার, বর্ণনাশৈলী, ব্যাকরণ, অলংকার ও অভিব্যক্তির বৈচিত্র্যের জন্য সুপরিচিত। কোরআন এই ভাষায় এমন এক অনন্য ভাষাশৈলী ও বর্ণনাভঙ্গি নিয়ে নাজিল হয়েছে, যা আরবের ভাষাবিশারদদেরও বিস্মিত করেছিল। এছাড়াও কোরআন শুধু মানুষের কাছে একটি বার্তা পৌঁছে দেয়নি; বরং তার ভাষা, শব্দচয়ন, ছন্দময়তা ও অর্থের গভীরতার মাধ্যমে মানুষকে চিন্তা ও উপলব্ধির দিকে আহ্বান করেছে। এ কারণেই কোরআন বারবার মানুষকে এর আয়াত নিয়ে চিন্তা করতে এবং গভীরভাবে উপলব্ধি করতে আহ্বান জানিয়েছে।