Islamic News BD - The Lesson of Peace
ফিতরা প্রদানরে সময়সীমা ও বণ্টন পদ্ধতি
শনিবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৩ ২২:১৫ অপরাহ্ন
Islamic News BD - The Lesson of Peace

Islamic News BD - The Lesson of Peace

আলহামদুলিল্লাহ, ওয়াস সালাতু ওয়াস সালামু আলা রাসূলিল্লাহ, আম্মা বাদঃ

ঈদের নামাযের পূর্বে ফিতরা প্রদান করা যেমন ইসলামের একটি সুন্দর বিধান, তেমন তা সঠিক সময়ে ও সঠিক নিয়মে বণ্টন করাও গুরুত্বপূর্ণ বিধান। কিন্তু দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ফিতরা বণ্টনের নিয়ম ভিন্ন ভিন্ন লক্ষ্য করা যায়। তন্মধ্যে একটি বহুল প্রচলিত নিয়ম হচ্ছে: লোকেরা তাদের ফিতরা মসজিদের ইমাম কিংবা গ্রামের সর্দারের কাছে ঈদের নামাযের পূর্বে আর অনেকে নামাযের পরে জমা করে দেয়। ফিতরা দাতারা ধান, গম, চাল এবং অনেকে টাকা দ্বারা ফিতরা দিয়ে থাকেন। অতঃপর ইমাম কিংবা সর্দার সাহেব কিছু দিন পর সেই জমা কৃত ফিতরা বিক্রয় করে দেন। তার পর তিনি সেই মূল্য অর্থাৎ টাকা-পয়সা বিতরণ শুরু করেন। ফিতরা যারা নিতে আসেন তাদের মধ্যে ফকীর-মিসকিন, মাদরাসার ছাত্র এবং ইসলামী প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাগুলিও থাকে। এরা অনেকে কাছাকাছি অঞ্চলের হয় আর অনেকে দূরেরও হয়। সাধারণত: এই পদ্ধতিতেই বেশির ভাগ স্থানে ফিতরা বণ্টন করা হয়ে থাক। কোথাও একটু ব্যতিক্রম থাকলে সেটা অবশ্য আলাদা কথা।
 

এই নিয়মকে কেন্দ্র করে সুন্নতের অনুসারী ভাইদের কয়েকটি বিষয় জানা একান্ত প্রয়োজন।

ক- কি কি জিনিস দ্বারা এবং কত পরিমাণ ফিতরা দেওয়া সুন্নত ?

খ- ফিতরা আদায়ের সময়সীমা কি ?

গ-নিজের ফিতরা নিজে বণ্টন করা উত্তম না ইমাম বা সর্দার দ্বারা বিতরণ করা উত্তম?

ঘ- ইমাম বা সর্দার সাহেব ঈদের পরে ফিতরার দ্রব্যাদি বিক্রয় করা পর্যন্ত যে কয়েক দিন দেরী করেন, তা করা কি ঠিক?

ঙ- ফিতরা পাওয়ার যোগ্য কারা কারা ? বা ফিতরার খাদ কি ?

 - কি কি জিনিস দ্বারা এবং কত পরিমাণ ফিতরা দেওয়া সুন্নত ?

এর উত্তর সহীহ হাদীসে স্পষ্ট বর্ণিত হয়েছে যার, ফল কথা হল: খেজুর, যব, কিশমিশ, পনীর কিংবা প্রধান খাদ্য দ্রব্য দ্বারা ফিতরা দেওয়া সুন্নত, মূল্য দ্বারা নয়। আর এক জন ব্যক্তিকে এক সা’ ফিতরা দিতে হবে, যার পরিমাণ সাধারণ মানুষের চার পূর্ণ অঞ্জলি সমান। [ফাতাওয়া মাসায়েল, মাওলানা কাফী, পৃঃ ১৭২-১৭৩] কেজির ওজনে তা আড়াই কিলোর কম নয়।

ইবনে উমার (রাযি:) হতে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন:

‘‘ আল্লাহর রাসূল যাকাতুল ফিতর স্বরূপ এক সা খেজুর কিংবা এক সা যব ফরয করেছেন মুসলিম দাস, স্বাধীন ব্যক্তি, পুরুষ ও নারী এবং ছোট ও বড়র প্রতি। আর তা লোকদের নামাযে বের হওয়ার পূর্বে আদায় করে দিতে আদেশ করেছেন। [ বুখারী, অধ্যায়: যাকাত হাদীস নং ১৫০৩/ মুসলিম নং ২২৭৫]

উক্ত হাদীসে দুটি খাদ্য দ্রব্যের নাম পাওয়া গেল যা, দ্বারা নবীর যুগে ফিতরা দেওয়া হত। একটি হচ্ছে খেজুর অপরটি যব। এবার নিম্নে আর একটি হাদীস পাঠ করুন।

আবু সাঈদ খুদরী (রাযি:) বলেন :

আমরা-নবীজীর যুগে যাকাতুল ফিতর বের করতাম এক শ্বা খাদ্য দ্রব্য কিংবা এক শ্বা যব কিংবা এক শ্বা খেজুর কিংবা এক শ্বা পনীর কিংবা এক শ্বা কিশমিশ [ বুখারী- ১৫০৬ মুসলিম-২২৮১]

এই হাদীসে খেজুর ও যব ছাড়া আরও যে কয়েকটি বস্তুর নাম পাওয়া গেল তা হল : কিশমিশ, পনীর এবং খাদ্য দ্রব্য। উল্লেখ থাকে যে,
নবীজীর মৃত্যুর পর মুয়াবিয়া (রাযি:) এর খেলাফত কালে অনেকে গম দ্বারা ফিতরা দিতেন। [ বুখারী হাদীস নং ১৫০৮ মুসলিম ২২৮১ ]


খ- ফিতরা আদায় করার সময়সীমা :

*ফিতরা আদায় করার উত্তম সময় হচ্ছে ঈদের দিনে ঈদের নামাযে বের হওয়ার পূর্বক্ষণে। অর্থাৎ ফিতরা দিয়ে নামায পড়তে যাওয়া।
ইবনে উমার থেকে বর্ণিত,
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যাকাতুল ফিতর আদায় করার আদেশ দেন লোকদের নামাযে বের হওয়ার পূর্বে । [ বুখারী, নং ১৫০৯ ]

*তবে ফিতরা দেয়ার সময় শুরু হয় রমযানের শেষ দিনে সূর্য ডুবার সাথে সাথে। [ সউদী ফাতাওয়া কমিটি ৯/৩৭৩]

*কেউ ঈদের এক দুই দিন পূর্বেও তা দিতে পারে কারণ সাহাবিদের মধ্যে কেউ কেউ ঈদের এক দুই দিন পূর্বে তা আদায় করতেন। [ বুখারী, নং১৫১১]

*কেউ ঈদের পরে ফিতরা দিলে সেটা সাধারণ দান হিসাবে গণ্য হবে এবং সে ফিতরার বিশেষ ফজিলত ও মর্যাদা হতে বঞ্চিত থাকবে। [ আবু দাউদ,অধ্যায়: যাকাত,অনুচ্ছেদ: ফিতরের যাকাত ]


গ- ফিতরা নিজে বিতরণ করা :

আসল হচ্ছে প্রত্যেক ব্যক্তি তার ফিতরা সে নিজে হকদারকে পৌঁছে দিবে। [ সউদী ফাতাওয়া কমিটি ৯/৩৮৯]

কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আদেশ:

এবং তিনি তা লোকদের নামাযে বের হওয়ার পূর্বে আদায় করে দেয়ার আদেশ করেন। কথাটি প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য স্বতন্ত্র আদেশ। এরকম নয় যে, সবাই একত্রে জমা করে তা বিতরণ কর। এই কারণে সাহাবী ইবনে উমার তাঁর ফিতরা হকদারদের এক দুই দিন পূর্বে বিতরণ করে দিতেন। [ বুখারী নং ১৫১১]

* নিয়ম হবে প্রত্যেক ব্যক্তি তার গ্রাম বা শহররে আশে পাশে যাকে ফিতরা পাবার হকদার মনে করবে তাকে ফিতরা দিয়ে আসবে। বর্তমানে সউদী আরবে অধিকাংশ লোকেই এই পদ্ধতিতে ফিতরা আদায় করে থাকে।

* তবে নির্ভরযোগ্য কোন সংস্থা , সর্দার বা ইমামকেও নিজ ফিতরা বণ্টনের প্রতিনিধি করা জায়েজ। [ সউদী ফাতাওয়া কমিটি ৯/৩৮৯] এ ক্ষেত্রে সঠিক নিয়মে ও সঠিক সময়ে বণ্টনের দায়িত্ব তাদের উপর বর্তাবে।


ঘ- ফিতরা একত্রে জমা করে কিছু দিন পর বিক্রয় করে মূল্য বিতরণ করা:

আমাদের মনে রাখা দরকার যে, খাদ্য দ্রব্য দ্বারাই ফিতরা দেওয়া সুন্নত; মূল্য দ্বারা নয়। যেমনটি উপরে বর্ণিত হয়েছে। খাদ্য দ্রব্য বিক্রি করে মূল্য বিতরণ করলে পরোক্ষভাবে মূল্য দ্বারাই ফিতরা দেওয়া হল যা, সুন্নতের বরখেলাফ। আর ঈদের নামাযের পূর্বে ফিতরা আদায় করার যে হাদীসগুলি বর্ণিত হয়েছে তার অর্থ এটা নয় যে, নামাযের পূর্বে ফিতরা জমা কর এবং পরে তা বিতরণ কর। এ বিষয়ে বর্ণিত হাদীসটি যয়ীফ, তবুও আবার পরে বলতে যদি ঈদের কয়েক দিন পরে বিতরণ করা হয়। ঈদের আগে ফকীর- মিসকিনদের হাতে খাবার পৌঁছালে না তারা আনন্দিত হবে বা খুশি করার সুযোগ পাবে। নচেৎ তাদের যেই সমস্যা অন্য দিনে থাকে তা ঈদের দিনেও থাকবে।

এ বিষয়ে সউদী স্থায়ী উলামা পরিষদের ফতোয়া :
জেদ্দার জামইয়াতুল বির (জন কল্যাণ সংস্থা) নামক সংস্থা সউদী ফাতাওয়া বোর্ডের নিকট প্রশ্ন করে যে, তারা অনেক এতীম, অভাবী ছাত্র, দুস্থ পরিবার ও বিকলাঙ্গদের আর্থিক সহযোগিতা সহ খাবার দ্রব্যাদি সরবরাহ করে থাকে। তারা কি লোকদের ফিতরা নিয়ে পরে ধীরে ধীরে বিতরণ করতে পারবে ? কিংবা টাকা-পয়সা নিয়ে তা দ্বারা পরে খাদ্য দ্রব্য কিনে তাদের মাঝে বিতরণ করতে পারবে ?

উত্তরে ফাতায়া বোর্ড বলেন :সংস্থার উপর জরুরী যে, তারা যেন ফিতরার হকদারদের মাঝে তা ঈদের নামাযের পূর্বেই বণ্টন করে দেয়। এর বেশী দেরী করা জায়েজ নয় ; কারণ নবী (সা:) ফকীরদের মাঝে তা ঈদের নামাযের পূর্বে পৌঁছে দিতে আদেশ করেছেন। সংস্থা ফিতরা দাতার পক্ষ হতে এক জন প্রতিনিধি স্বরূপ। সংস্থা সেই পরিমাণেই ফিতরা গ্রহণ করবে , যেই পরিমাণ সে ঈদের নামাযের পূর্বে বণ্টন করতে সক্ষম। আর ফিতরায় মূল্য দেওয়া জায়েজ নয়। কারণ শরীয়তী দলীলসমূহ খাদ্য বস্তু দ্বারা ফিতরা বের করাকে জরুরী করেছে। তাই শরীয়তী দলীলের পরিবর্তে কোন মানুষের কথার দিকে ভ্রুক্ষেপ করা যাবে না। আর ফিতরা দাতারা যদি সংস্থাকে অর্থ দেয় এই উদ্দেশ্যে যে সংস্থা সেই অর্থ দ্বারা খাদ্য দ্রব্য ক্রয় করে তা ফকীরদের মাঝে বিতরণ করবে, তাহলে সংস্থাকে ঈদের নামাযের পূর্বেই তা বাস্তবায়ন করতে হবে। সংস্থার জন্য বৈধ নয় যে, সে মূল্য বের করবে। [ ফতুয়া নম্বর ১৩২৩১, খণ্ড ৯/৩৭৭]

ঙ- ফিতরার হকদার কারা ?

ফিতরা পাবার যোগ্য কারা বা ফিতরার হকদার কোন্ কোন্ প্রকারের লোকেরা ? এ বিষয়ে ইসলামী বিদ্বানগণের মতভেদ রয়েছে।

একদল বিদ্বান মনে করেন:যারা সাধারণ সম্পদের যাকাতের হকদার তারাই ফিতরের যাকাতের (ফিতরার) হকদার। আর তারা হল আট প্রকারের লোক:

১- ফকীর

২- মিসকিন

৩- সাদাকা আদায়ের জন্য নিযুক্ত কর্মচারী

৪- যাদের অন্তর ইসলামের পথে আকর্ষণ করা প্রয়োজন

৫-দাস-মুক্তির জন্যে

৬- ঋণগ্রস্তদের ঋণ পরিশোধের উদ্দেশ্যে

৭- আল্লাহর রাস্তায়

৮- মুসাফিরদের সাহায্যার্থে ( সূরা তওবা /৬০]

এই মত পোষণকারীদের দলীল হল :ফিতরের সাদাকাকে অর্থাৎ ফিতরাকে নবীজী যাকাত ও সাদাকা বলেছেন তাই যেটা মালের যাকাতের খাদ হবে, সেটাই ফিতরারও হবে। সাদাকার যেই খাদ আল্লাহ সূরা তওবায় উল্লেখ করেছেন সেই খাদ সাদাকাতুল ফিতরের জন্যও হবে।

অন্য এক দল বিদ্বান মনে করেন :সাদাকাতুল ফিতর বা ফিতরা কেবল ফকীর মিসকিনদের হক, অন্যদের নয়।

এই মত পোষণকারীদের দলীল হল :ইবনে আব্বাস (রাযি:) এর হাদীস, তিনি বলেন :
আল্লাহর রাসূল ফিতরের যাকাত (ফিতরা) ফরয করেছেন রোজাদারের অশ্লীলতা ও বাজে কথা-বার্তা হতে পবিত্রতা এবং মিসকিনদের আহার স্বরূপ .. [আবু দাউদ, যাকাতুল ফিতর নং ১৬০৬/ হাদীস হাসান, ইরওয়াউল গালীল নং ৮৪৩]

এই মতকে সমর্থন জানিয়েছেন ইবনে তাইমিয়্যাহ, ইবনুল ক্বাইয়্যূম, শাওকানী, আযীমাবাদী, ইবনু উসাইমীন সহ আরও অনেকে। [ দেখুন: মাজমুউ ফাতাওয়া ২৫/৭৩,যাদুল মাআদ ২/২২, নায়লুল আউত্বার ৩-৪/৬৫৭, আওনুল মাবূদ ৫-৬/৩, শারহুল মুমতি ৬/১৮৪]