
ইসলামে ফরজ বিধানগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি ফরজ ইবাদত হলো পর্দা। পর্দার কথা আল্লাহ তায়া’লা স্বয়ং কোরআনে বলেছেন : আর মুমিন নারীদের বল যেন তারা তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। (২৪:৩১)। নারীদেরকে বলেই আল্লাহ তায়া’লা থেমে যাননি; ছেলেদের ক্ষেত্রেও পর্দার বিধানের কথা আল্লাহ তায়া’লা কোরআনে বলেছেন : মুমিন পুরুষদেরকে বল তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং তার লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। (২৪:৩০)। এ থেকে বোঝা যায় ইসলামে পর্দার বিধানকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এবং তা মানার জন্য আল্লাহ তায়া’লা স্বয়ং কুরআনে মুমিনদের উদ্দেশ্য করে বলেছেন।
পর্দা সম্পর্কে শুধু আল্লাহ তায়া’লা কোরআনে বলেননি; মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম হতে বর্ণিত বিভিন্ন হাদিস এবং বিখ্যাত সাহাবীদের উক্তিও কথিত রয়েছে। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু হতে বর্ণিত একটি হাদিসে বলা হয়েছে - ‘আল্লাহ নারীদের চাদর দিয়ে শরীর ঢেকে রাখার নির্দেশ দিয়েছেন যাতে তাদের চেনা না যায়।’ এছাড়াও হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু এ বর্ণিত বিখ্যাত উক্তি কথিত রয়েছে - ‘নারীরা যদি জানতো যে পুরুষরা তাদের আড্ডায় তাদের নিয়ে কী কী আলোচনা করে বা তাদের প্রতি কেমন দৃষ্টি রাখে, তাহলে তারা নিজেদের লোহা দিয়ে ঢেকে রাখতো।’ অর্থাৎ, শুধু কোরআনেই নয়, হাদিস এবং সেই সময়কার বিখ্যাত সাহাবীগণের উক্তিতেও পর্দার গুরুত্বের দিকটি সুচারুরূপে ফুটে ওঠেছে।
তবে বর্তমান পশ্চিমা কুসংস্কৃতির প্রভাবে প্রভাবিত সমাজ এ ফরজ বিধানটি মানতে যেন নারাজ। অপ্রিয় হলেও সত্য যে পুরো জেনারেশন আজ শরীর প্রদর্শনের এক কুৎসিত খেলায় মেতেছে। এসব আধুনিক সংস্কৃতিমনা নারী পর্দানশীল নারীদের কাছে এক আতঙ্কের নাম। শরীর প্রদর্শনকারী নারীদের বিপরীতে রয়েছে পর্দানশীল নারী সমাজ, যারা নিজেদের শরীর আবৃত রাখতেই সদা নিয়োজিত। একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ নয়; বরং একই মুদ্রার একই পিঠ হয়েও তারা আজ বিচ্ছিন্ন, ভিন্ন মতাদর্শে লালায়িত।
ইসলামের আদর্শে উজ্জীবিত নারীরা যখন মার্জিত পোশাক পরিচ্ছদ পরিধান করছে, তখন তা উচ্চ ডিগ্রীধারী কিংবা অক্ষরজ্ঞানহীন তথাকথিত সমাজ বা সম্প্রদায়ের কাছে দৃষ্টিনন্দন লাগে না। হেদায়েত প্রাপ্ত ইসলামের আদর্শে নিবেদিত প্রাণ মুসলিমদের আকাশ কখনোই মেঘমুক্ত ছিলো না। আকাশে কালো মেঘের আনাগেনা সবসময় প্রতীয়মান। সেই সুবাদে পর্দানশীল মেঘমুক্ত থাকার কথা নয়। যখন তারা নিজেদের ধর্মের ফরজ বিধান পালনে একনিষ্ঠ, তখনই কালো মেঘ নামক তথাকথিত সমাজ দাঁড়ায় প্রতিরোধক হিসাবে।
মার্জিত পোশাক পরিধানে তাকে হতে হয় বন্ধুমহল, আত্মীয়-স্বজন, এমনকি শ্রণিকক্ষে স্যারদের মাধ্যমেও অপদস্ত; হতে হয় হাসির পাত্র। বাংলাদেশে এমন অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষকম-লী রয়েছে, যেখানে মেয়েরা উপযুক্ত পরিবেশের অভাবে কিংবা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক আরোপিত নিয়ম মেনে নিতে পর্দা করতে অক্ষম। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এর প্রভাব আরও ব্যাপক ও ভয়াবহ। ভাইভা, প্রেজেন্টেশনের মতো কার্যাবলীতে শাড়ির কদর অনেক বেশি।তাই বোরখা পড়া মেয়েটাও ভালো নম্বরের আশায় বোরখা ছেড়ে শাড়ি পরিধান করছে।সেখানে মুখ ঢাকা নারী শিক্ষার্থীকে অনেক সময় স্বাভাবিক দৃষ্টিতে দেখা হয় না।
গ্রামাঞ্চলে পর্দার বিধান মানা ধর্মপ্রাণ মা-বোনদের পক্ষে আরও দুরূহ হয়ে ওঠে। সমাজের লোকের কটুক্তি বাবা-মায়ের অজ্ঞতা কিংবা অসহযোগিতার মনোভাবের ফলেই তাদের এই বিধান মানা অসম্ভবপ্রায় হয়ে ওঠে।অনেক পরিবারে দেখা যায়, বাবা-মা বিশেষ শিক্ষিত বা জ্ঞানসম্পন্ন না হওয়ায় সচেতনতার অভাবে নিজেরাই নিজেদের কন্যাকে মাঠে বাহির করতেও কুণ্ঠিতবোধ করেন না। দ্বীনের জ্ঞানহীন অভিভাবকরা পর্দা পালনের মত পরিবেশ তৈরি করতে সম্মত না, ফলে মেয়েরা চাইলেও তাদের পর্দার বিধান পালন করতে পারে না উম্মুক্ত পরিবেশে। একইভাবে একটি মেয়ে যখন শ্বশুরবাড়িতে যায়, সেখানে উপযুক্ত পরিবেশের অভাবে পর্দা পালন করতে অক্ষম হয়।
তাই ইসলামিক দৃষ্টিকোণ থেকে কুফু মেনে বিয়ের কথা বলা হয়েছে। কুফু শব্দের অর্থ হলো সমতা, সমতুল্য বা সমকক্ষ। বৈবাহিক ক্ষেত্রে বর-কনের দ্বীনদারিতা, বংশ, সম্পদ, সামাজিক অবস্থান, পেশাগত দিক থেকে সম্মান বা কাছাকাছি পর্যায়ের হাওয়াকে কুফু বলে। এটি মূলত দাম্পত্য জীবনের বোঝা-পড়া বিষয়ক একটি ইসলামিক ধারণা। কুফু মেনে বিয়ে না করলে একটি মেয়ে তার শ্বশুরবাড়ির গিয়ে উপযুক্ত পরিবেশ পরিস্থিতির অভাবে পর্দা পালন করতে ব্যর্থ হয়। তাই পর্দা পালনে আগ্রহী বোনদের কুফু মেনে বিবাহ করা উত্তম। এতে পর্দার বিধান পালনের পথ অনেকটাই সুগম হয়।
বর্তমান আধুনিকতার ছোঁয়ায় নির্মিত সমাজে দুঃখজনকভাবে পর্দার অবনতি দিন দিন বেড়েই চলেছে। যদিও দেশে ইসলামিক আলোচনা হয়ে থাকে তবে তার সংখ্যা অপ্রতুল। বেশি বেশি ইসলামিক আলোচনা সভার আয়োজন করতে হবে। আলোচনা সভার আয়োজন উদ্দেশ্যহীনভাবে, কিংবা মসজিদের আর্থিক উন্নয়নকে উদ্দেশ্য করে নয়; বরং তা হতে হবে জ্ঞান দানের উদ্দেশ্যকে কেন্দ্র করে।
কিন্তু বর্তমানে এর মূল উদ্দেশ্য বিচ্ছিন্ন হয়ে সভার আয়োজন করা হয়ে থাকে; যা জ্ঞান বিবর্জিত মানুষগুলোর কোন উপকারে আসে না। ইসলামী জলসাগুলোতে নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে আলোচনা করা হলে ইসলামিক জ্ঞান বিবর্জিত এই লোকগুলো ইসলামের দিকে ধাবিত হতে সক্ষম হবে। জলসাগুলোর মূল লক্ষ্য হতে হবে এমন - যে মা-বোন তাদের শরীর প্রদর্শনের প্রতিযোগিতায় নেমেছে, সে সকল মা-বোনদের টনক নাড়ানো এবং একইসাথে সে সকল পুরুষ, যারা পর্দাকে কটাক্ষ দৃষ্টিতে দেখে, তাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন জরুরি। উভয়ের সম্মিলিত প্রয়াস ব্যতিত সমাজের অগ্রগতি সম্ভব নয়। এছাড়াও সকল মা বোনকে নিজ নিজ স্থান থেকে সচেতন হতে হবে পর্দার ফরজ বিধানটি পালনে। তবেই দেশ ও রাষ্ট্রের অশ্লীলতা দূর হবে। দেশ হয়ে ওঠবে শ্লীল, সুশৃঙ্খল ও মার্জিত।