Islamic News BD - The Lesson of Peace
সত্য ও ন্যায়ের পথে ইমাম হুসাইন (রা.) এক আপোষহীন সিপাহসালার
বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬ ১৮:৫২ অপরাহ্ন
Islamic News BD - The Lesson of Peace

Islamic News BD - The Lesson of Peace

হযরত ইমাম হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন অত্যন্ত সাহসী, দৃঢ় মনোবলের অধিকারী, অকুতোভয় সৈনিক। জিহাদের ডাকে প্রয়োজনের মুহূর্তে সাড়া দিতে কখনো পিছপা হতেন না তিনি। তাঁকে একবার হযরত মুয়াবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর নিকট দূত হিসেবে পাঠানো হয়েছিল। তিনি সামরিক বাহিনীর সাথে কনস্টান্টিনোপলে (ইস্তাম্বুল অভিযানের) যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। সাহাবীয়ে রাসূল হযরত আমীরে মুয়াবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর মৃত্যুর পর ৬৮০খ্রিস্টাব্দে ইয়াজিদ বিন মুআবিয়া ক্ষমতায় বসেই স্বৈরাচারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। বস্তুত সে ছিল দুশ্চরিত্রের, বেনামাজি ও মদ্যপায়ী। তাই সে ইসলামে চিরতরে নিষিদ্ধ মধ্যপান, সুদ ও একই সাথে দুই সহোদরাকে বিবাহ করা প্রভৃতি হারাম কাজকে বৈধ বলে ঘোষনা দেয়। ফলে সমাজে ব্যভিচার, জুয়া, মদ্যপানসহ নানা রকম অনাচার বিস্তার লাভ করে। এ অবস্থায় ধর্মপ্রাণ, সজ্জন ও বিবেকবান মুসলমানগণ উদ্বিগ্ন ও বিচলিত হয়ে পড়েন।

দুঃশাসন, অন্যায়, অনাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ কিংবা প্রতিরোধ গড়ে তোলার পরিবেশ পর্যন্ত উধাও হয়ে যায়। দমন, পীড়ন ও জুলুমের ভয়ে মানুষ নিশ্চুপ থাকাকেই শ্রেয়জ্ঞান করে। এহেন অবস্থার প্রেক্ষাপটে কুফাবাসী ইমাম আলী মকাম রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুকে ১৫০ মতান্তরে ১২০০ চিঠির মাধ্যমে কুফায় যেতে অনুরোধ করে। তারা ইয়াজিদকে খলিফা হিসেবে দেখতে চায় না, তারা তাঁকে খিলাফতের অধিক যোগ্য, তাঁর জন্য জানমাল কোরবানির জন্য প্রস্তুত এবং আহলে বায়াতের অনুরক্ত এমন পয়গাম পাঠায়। কুফাবাসীর এই পুনঃ পুনঃ ডাক ও স্বনির্বদ্ধ অনুরোধে সাড়া দিতে মনস্থির করেন তিনি।


তাদের চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য তিনি আপন চাচাতো ভাই মুসলিম বিন আকিল রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুকে কুফায় পাঠান। কুফার গভর্নর নুমান বিন বশিরসহ ৪০ হাজার মানুষ ইমাম মুসলিমের হাতে হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুর নামে বায়াত গ্রহণ করেন। পরিস্থিতি তাঁর অনুকূলে এমন বর্ণনা দিয়ে মুসলিম ইবনে আকিল রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু একজন পত্রবাহককে চিঠি দিয়ে তাঁকে কুফায় আসতে অনুরোধ জানান। চিঠি লেখার পর পরই অবস্থা অন্যরকম হয়ে যায়। তাঁর আগমনের সংবাদ ইয়াজিদ জানতে পেরে উত্তেজিত হয়ে কুফার গভর্ণর নোমান ইবনে বশিরকে পদচ্যুত করে ওবায়দুল্লাহ ইবনে জিয়াদকে কুফার দায়িত্ব প্রদান করে এবং হুকুম জারি করে হুসাইন যেন কোনোভাবেই কুফায় প্রবেশ করতে না পারে। প্রয়োজনে তাঁর সাথে যুদ্ধ করার সে নির্দেশও দেয় ইয়াজিদ। ওবায়দুল্লাহ ইবনে জিয়াদ দ্রুত কুফায় এসে দেখে, তার প্রাসাদ মুসলিম ইবনে আকিল ও তাঁর অনুসারীরা ঘেরাও করে আছেন। তিনি সৈন্য দিয়ে হামলা চালিয়ে তাদের হত্যার হুমকি দেন। এতেই কাজ হয়। সবাই দ্রুত সে স্থান ত্যাগ করে। একজনকেও মুসলিম ইবনে আকিল তার পাশে দেখতে পান নি। অতঃপর ইবনে জিয়াদ তাঁকে গ্রেফতার করে নির্মমভাবে হত্যা করেন। হত্যার আগে তিনি ইমাম হযরত হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুকে আরেকটি চিঠি দিয়ে কুফায় আসতে নিষেধ করেন।


এই চিঠি তাঁর কাছে পৌঁছার আগেই তিনি কুফাবাসীর অস্থির চিত্তের জন্য আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু সহ অনেকের বাধা সত্তে¦ও ৬০ হিজরির ৮ জিলহজ পরিবার-পরিজন, বন্ধু-বান্ধব ও প্রিয়জনদের সঙ্গে নিয়ে তিনি মক্কা মুকার্রমা থেকে কুফার উদ্দেশে রওনা দেন। পথিমধ্যে তাঁর চাচাতো ভাই আবদুল্লাহ বিন জাফর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু সাক্ষাৎ করে মদিনার গভর্নর কর্তৃক প্রদত্ত নিরাপত্তা সনদের ভিত্তিতে মদিনায় ফিরে যাওয়ার অনুরোধ করলে তিনি বলেন, আমি স্বপ্নে নানাজির সাক্ষাৎ পেয়েছি। তিনি আমাকে একটি কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন। ফলাফল যাই হোক না কেন, আমি অবশ্যই তা করব আর কাজটি কী, সে সম্পর্কে মৃত্যুর আগে আমি কাউকে কিছু বলতে পারি না। কুফা থেকে দুই মঞ্জিল দূরে তিনি ‘যি জাশাম’ নামক স্থানে ইয়াজিদ বাহিনীর দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত হন। এক হাজার সৈন্যের এ বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন হুর ইবনে ইয়াজিদ। তিনি হযরত ইমাম হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও সহানুভূতিপ্রবণ ছিলেন। তবে নির্দেশিত দায়িত্ব পালনেও ছিলেন দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। হযরত ইমাম আলী মকাম তার কাছে কুফাবাসীর চিঠি ও দূত মারফত তাঁকে আমন্ত্রণ জানানোর কথা বলেন। হুর ইবনে ইয়াজিদ এ ব্যাপারে তার অজ্ঞতার কথা উল্লেখ করেন।

.এক পর্যায়ে হযরত ইমাম হোসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু তাঁকে সামনে যাওয়ার অথবা ফিরে যাওয়ার অনুমতি দিতে অনুরোধ জানান। হুর ইবনে ইয়াজিদ তার অপারগতা প্রকাশ করেন। বরং ইবনে জিয়াদের নির্দেশ মোতাবেক এমন একটা জায়গায় হযরত ইমাম হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর কাফেলাকে ঠেলে নিয়ে যান, যেখানে কাফেলা অধিকতর অনিরাপদ হয়ে পড়ে। হুর ইবনে ইয়াজিদ কাফেলাকে কারবালা প্রান্তরে নিয়ে যান। ইমাম আলী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু স্থানটির নাম জানতে চাইলে তাঁকে জানানো হয়, জায়গাটির নাম কারবালা। শুনে হযরত ইমাম হোসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেন: এটা দুঃখ ও বালা মুসিবতের জায়গা। এখানেই আমাদের অবতরণের, রক্ত ঝরানোর ও কবরের স্থান। ওদিকে ওবায়দুল্লাহ ইবনে জিয়াদ আমর ইবনে সাদের নেতৃত্বে চার হাজার সৈন্যের একটি দল প্রেরণ করে হযরত ইমাম হোসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য। পরবর্তীতে আরো সৈন্য পাঠানো হয় এবং ঐতিহাসিকদের মতে, মোট সৈন্য সংখ্যা অন্তত ২০ হাজারে গিয়ে দাঁড়ায়।

অথচ, যার বিরুদ্ধে যুদ্ধের এই বিশাল আয়োজন, তাঁর কাফেলায় মোট লোকসংখ্যা একশ’র বেশি নয়। যাদের মধ্যে কিছু নারী ও শিশুও ছিলেন। বস্তুত হযরত ইমাম হোসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু যুদ্ধ করার জন্য আসেননি। ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধ, সংঘাত, হানাহানি তিনি একেবারেই পছন্দ করতেন না। তিনি শান্তি-নিরাপত্তা, ভ্রাতৃত্ব, পারস্পারিক সহাবস্থান দৃঢ় করার পক্ষে আন্তরিক ছিলেন। যখন কারবালা প্রান্তরে তিনি, তাঁর পরিবার ও সঙ্গী-সাথীরা ইয়াজিদের সৈন্যদের ঘেরাওয়ের মধ্যে শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় পতিত, অবরুদ্ধ ইমাম বাহিনীর তাঁবুর পাশেই ফোরাত নদী। তাঁবু থেকে নদীর বয়ে যাওয়া কলকল ধ্বনি কানে আসে; কিন্তু ফোরাতের এক ফোঁটা পানিও মুখে পড়ে না ইমাম বাহিনীর। কারণ এজিদের পাপিষ্ঠ সৈনিক দল যে নদীও অবরুদ্ধ করে রেখেছে। মরুভূমির প্রচন্ড গরম এবং উত্তপ্ত বালিতে সকলেরই প্রাণ যেন ওষ্ঠাগত। এতদসত্ত্বেও তিনি পাপীষ্ঠ ইয়াজিদের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ না করার সিদ্ধান্তে অটল এবং আত্মসমর্পণে একেবারেই নারাজ। তিনি বরং যুদ্ধ ও রক্তপাত এড়ানোর জন্য সচেষ্ট।

.তিনি আমর ইবনে সাদের কাছে এই মর্মে প্রস্তাব দেন: ১. আমাকে সেখানেই যেতে দাও, যেখান থেকে আমি এসেছি। ২. আমাকে স্বয়ং ইয়াজিদের সঙ্গে বসে একটা সিদ্ধান্তে উপনীত হতে দাও। ৩. আমাকে কোনো মুসলিম দেশের সীমান্তে পাঠিয়ে দাও। সে দেশের জনগণের যে অবস্থা হয় আমিও তা গ্রহণ করবো। যা আমর বিন সাদের পছন্দ হয়। সে তা ওবায়দুল্লাহ ইবনে জিয়াদের কাছে পাঠায়। প্রস্তাব ৩টি ইবনে জিয়াদেরও মনোপূত হয়। কিন্তু বাধা আসে সিমারের কাছ থেকে। তার প্ররোচনায় ওবায়দুল্লাহ ইবনে জিয়াদ আমর বিন সাদকে এ মর্মে বার্তা পাঠায় যে, ‘ইমাম হুসাইন যদি তাঁর সঙ্গী-সাথীরাসহ আমার কাছে আত্মসমর্পণ করে তবে যুদ্ধ করবে না। তাদের আমার কাছে নিয়ে আসবে। আর যদি তারা আত্মসমর্পণ না করে তবে যুদ্ধ ছাড়া গত্যন্তর নেই।’ কিন্তু বাতিলের বিরুদ্ধে আপোষহীন, হক্বের ঝান্ডা বাহক ইমাম হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু ইবনে যিয়াদের সেই প্রস্তাব ঘৃণাভরে প্রত্যাখান করেন।

অবশেষে ৯ই মুহাররম রাতে ইমাম আলী মকাম রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু নিজ সাথীদের সাথে পরামর্শ করেন। পরদিন ১০ই মুহাররম ৬১ হিজরীতে ফজর নামাজের পর যুদ্ধ যখন অনিবার্য তখন ইমাম হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু এক আবেগঘণ ভাষণ দেন। তাঁর সেই ভাষণ পাপিষ্ট অন্তরগুলোয় কোন রেখাপাত করেনি। এরপর শুরু হয় তুমুল যুদ্ধ। অন্যায়, অবিচার, স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে ন্যায় ও সত্যের জন্য রণাঙ্গনে অকুতোভয় লড়াই করে একে একে তিনি সহ ৭২ জনের সবাই বীরত্বের সাথে শাহাদাতের সুধা পান করেন। কুখ্যাত সীমারের নির্দেশে সিনান বিন আনাস হযরত ইমাম হুসাইনের মাথা মুবারক শরীর থেকে আলাদা করে। (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন) হত্যা ও মাথা বিচ্ছিন্ন করার পরও উন্মত্ত সীমার ঘোড়ার খুরের আঘাতে তাঁর মৃতদেহ ক্ষতবিক্ষত করতে থাকে।

কিন্তু সে কাঁদন পাষাণ হৃদয় সীমারদের কাঁদাতে পারেনি। তবে সে দৃশ্যে আজও মুসলিম উম্মাহর অশ্রু ঝরছে। পরিবারের নারী ও শিশুসহ বাকি ১২৮ জন সদস্য বন্দী হন। যুদ্ধ শেষে শহীদদের শিরোচ্ছেদ করে ইয়াজিদের বেরহম সৈনিকরা। শহীদদের লাশ বিকৃত করা হয় এবং ঘোড়া দিয়ে পাড়ানো হয়। হযরত ইমামের পরিবারের শিবিরের তাবুতে লুটপাট করা হয়। তাদের হত্যা বা পুড়িয়ে মারার চেষ্টাও হয়। ছিন্ন মস্তকসমূহ ওবায়দুল্লাহ ইবনে জিয়াদের কাছে পাঠানো হয়।

পরিশেষে বলা যায়, সত্য ও ন্যায়, সাম্য ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য স্বৈরাচারী ইয়াজিদের বিরুদ্ধে হজরত ইমাম হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু ও তাঁর সঙ্গী-সাথিরা যেভাবে বীর বিক্রমে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন, সেই ত্যাগ চিরকাল দেশে দেশে যুগে যুগে এ ধরনের সঙ্কট ও সমস্যা উত্তরণের ব্যাপারে প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। সত্যের পথে এবং অসত্যের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারীদের তা জোগাবে হিম্মত ও প্রেরণা।