→ রিজিক বৃদ্ধির শ্রেষ্ঠ আমল→ নখ কাটার পর অজু না করে নামাজ পড়া যাবে?→ মাটির নিচে আল্লাহর সৃষ্টির বিস্ময়→ বাংলাদেশিদের জন্য সউদীর নতুন প্যাকেজ ভিসা চালু→ অবশেষে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন ইরানের নিহত সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি
No icon

উপমহাদেশের বিস্মৃতপ্রায় এক ক্ষণজন্মা মনীষী ডক্টর মুহাম্মদ হামিদুল্লাহ

বিংশ শতাব্দীর মুসলিম বিশ্বে যে কয়জন আলিম-গবেষক একাধারে ইতিহাসবিদ, আইনবিদ, ভাষাবিদ এবং হাদিসশাস্ত্রবিদ হিসেবে বিশ্ব-স্বীকৃতি অর্জন করেছেন, ডক্টর মুহাম্মদ হামিদুল্লাহ তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য। উপমহাদেশের হায়দ্রাবাদ দাক্ষিণাত্যে জন্ম নেওয়া এই মনীষি সারাজীবন প্যারিসে রাষ্ট্রহীন উদ্বাস্তু হয়ে কাটিয়েছেন, অথচ তাঁর কলম থেকে বেরিয়েছে আড়াইশোরও বেশি গ্রন্থ এবং হাজারেরও অধিক প্রবন্ধ,আরবি, উর্দু, ফারসি, ইংরেজি, ফরাসি, জার্মান ও তুর্কি ভাষায়। 

তিনি একদিকে যেমন হাদিস সংরক্ষণের প্রাচীনতম পাণ্ডুলিপি উদ্ধার করে প্রাচ্যবিদদের মৌখিক-প্রবাহ তত্ত্বের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছেন, অন্যদিকে ইসলামি আন্তর্জাতিক আইনের উপর এমন এক গ্রন্থ রচনা করেছেন যা আজও পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত। 

মুহাম্মদ হামিদুল্লাহ জন্মগ্রহণ করেন ১৯০৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে, তৎকালীন হায়দ্রাবাদ রাজ্যের রাজধানী হায়দ্রাবাদ শহরে। তিনি ছিলেন তিন ভাই ও পাঁচ বোনের মধ্যে সবার ছোট। তাঁর জ্ঞানচর্চার শিকড় ছিল বংশানুক্রমিক,তাঁর প্রপিতামহ ও পিতা উভয়েই ছিলেন বিশিষ্ট ইসলামিক চিন্তাবিদ। প্রপিতামহ মুহাম্মদ সিবগাতুল্লাহ একাই ২৯টি আরবি, ২৪টি ফারসি এবং ১৪টি উর্দু গ্রন্থ রচনা করে ছিলেন। পিতা মুফতি আবু মুহাম্মদ খলিলুল্লাহ ছিলেন ফিকহশাস্ত্রের একজন প্রাজ্ঞ আলিম, নিজামের সরকারে রাজস্ব বিভাগের পরিচালক, এবং হায়দ্রাবাদে সুদমুক্ত ব্যাংকিং ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পথিকৃৎ। 

 

হামিদুল্লাহর প্রাথমিক শিক্ষা হায়দ্রাবাদেই সম্পন্ন হয়। তিনি জামিয়া নিজামিয়া থেকে সুনামের সাথে ‘কামিল’ এবং পরে ওসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলামি ফিকহে এমএ এবং আইনে এলএলবি সম্পন্ন করেন। মাত্র ষোলো বছর বয়সে, ১৯২৪ সালেই তাঁর লেখালেখির জীবন শুরু হয়ে যায়,যা তাঁর অসাধারণ মেধা ও অধ্যবসায়ের প্রথম সাক্ষ্য।

 

তাঁর শিক্ষাজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো তাঁর উস্তাদ মাওলানা সাইয়িদ মানাজির আহসান গিলানির (১৮৯২-১৯৫৬) সান্নিধ্য। গিলানি ছিলেন দারুল উলুম দেওবন্দের একজন কৃতী ছাত্র, যিনি শায়খুল হিন্দ মাহমুদুল হাসান দেওবন্দির কাছে বুখারি ও তিরমিজি অধ্যয়ন করেছিলেন। পরবর্তীতে তিনি ওসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মতত্ত্ব অনুষদের ডিন হিসেবে পঁচিশ বছর দায়িত্ব পালন করেন এবং সেখানেই তাঁর সবচেয়ে খ্যাতিমান ছাত্র হিসেবে গড়ে ওঠেন মুহাম্মদ হামিদুল্লাহ।

এরপর তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য ইউরোপে পাড়ি জমান। ১৯৩৫ সালে জার্মানির বন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি এবং ১৯৩৬ সালে ফ্রান্সের সরবোন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে দ্বিতীয় ডক্টরেট অর্জন করেন। তবে তিনি ছিলেন দেওবন্দি ভাবধারার অত্যন্ত আস্থাভাজন।  

 

উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর প্রভাবশালী প্রাচ্যবিদরা দীর্ঘদিন ধরে একটি তত্ত্ব প্রচার করে আসছিলেন, তা হলো- হাদিস বহু শতাব্দী ধরে শুধু মৌখিকভাবে প্রচলিত ছিল এবং তা লিখিত আকারে সংকলিত হয়েছে নবীজির যুগ থেকে বহু পরে, ফলে তার ঐতিহাসিক নির্ভরযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ। এরই প্রেক্ষিতে ডক্টর মুহাম্মদ হামিদুল্লাহ তাঁর জীবনের সবচেয়ে আলোচিত গ্রন্থ রচনা করেন। যা ১৯৫৫ সালে ‘সহিফা হাম্মাম ইবনে মুনাব্বিহ’ নামে প্রকাশিত হয়েছিল ।

হাম্মাম ইবনে মুনাব্বিহ ছিলেন বিশিষ্ট সাহাবি আবু হুরায়রা (রা)-এর সরাসরি ছাত্র, এবং তাঁর সংকলিত এই সহিফাটি নবীজি (সা) এর জীবদ্দশাতেই লিখিত আকারে হাদিস সংরক্ষণের অকাট্য প্রমাণ। প্রাচীন এই বিখ্যাত হাদিস-পাণ্ডুলিপিটি আজো অন্যতম বিশ্বব্যাপি সমাদৃত। তবে ডক্টর মুহাম্মদ হামিদুল্লাহর রচনাসম্ভার এতটাই বিপুল যে তার সম্পূর্ণ তালিকা একসঙ্গে করা প্রায় অসম্ভব। আড়াইশোরও বেশি গ্রন্থ এবং সাতটি ভাষায় লেখা হাজারেরও বেশি প্রবন্ধ। 

১৯৫৫-৫৬ সালে হামিদুল্লাহকে পাকিস্তানের প্রথম সংবিধান রচনার প্রক্রিয়ায় পরামর্শদাতা হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়। তারপর ১৯৮৫ সালে পাকিস্তান সরকার তাঁকে দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার ‘হিলাল-ই-ইমতিয়াজ’ এ ভূষিত করা হয়।  

হামিদুল্লাহ কখনো বিবাহ করেননি। জ্ঞানচর্চাই ছিল তাঁর একমাত্র নিমগ্নতা। বাইশটিরও বেশি ভাষায় তিনি ছিলেন পন্ডিত। চুরাশি বছর বয়সেও তিনি নতুন করে থাই ভাষা শিখতে শুরু করেছিলেন,যা তাঁর জ্ঞানপিপাসার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। ১৯৯৬ সালে অসুস্থতার কারণে তিনি প্যারিস ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রের জ্যাকসনভিলে চলে যান, যেখানে তাঁর ভাইয়ের নাতনি সাদিদা তাঁর শেষ জীবনের দেখাশোনা করেন। ২০০২ সালের ১৭ ডিসেম্বর, ফজরের নামাজ আদায়ের পর তিরানব্বই বছর বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন।