দুনিয়ার জীবন ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু আখিরাত চিরস্থায়ী। একজন বুদ্ধিমান মুমিন সেই ব্যক্তি, যিনি মৃত্যুর আগেই নিজের জন্য এমন কিছু আমল রেখে যান যা কবরের অন্ধকারেও তার জন্য নূর হয়ে থাকবে।
একটি মসজিদ, একটি নলকূপ, একটি কোরআন, একটি গাছ কিংবা একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—এসব ছোট উদ্যোগও হতে পারে অনন্ত সওয়াবের উৎস। আর মানুষের জীবনের সবচেয়ে নিশ্চিত সত্য হলো মৃত্যু। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৮৫)
মৃত্যুর মাধ্যমে মানুষের আমলের খাতা বন্ধ হয়ে যায়। তবে ইসলামের সৌন্দর্য হলো, কিছু নেক আমল এমন আছে যার সওয়াব মৃত্যুর পরও অব্যাহতভাবে পৌঁছাতে থাকে। এগুলোকে বলা হয় সদকায়ে জারিয়া বা চলমান সদকা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মানুষ যখন মারা যায়, তখন তার সব আমল বন্ধ হয়ে যায়; তবে তিনটি আমল বন্ধ হয় না— সদকায়ে জারিয়া, এমন জ্ঞান যা দ্বারা মানুষ উপকৃত হয় এবং নেক সন্তান যে তার জন্য দোয়া করে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৬৩১)
তাই একজন দূরদর্শী মুমিনের উচিত এমন কিছু নেক কাজ করে যাওয়া, যা মৃত্যুর পরও তার আমলনামায় সওয়াবের ধারা অব্যাহত রাখবে।
১. মসজিদ নির্মাণে সহযোগিতা
মসজিদ আল্লাহর ঘর। যারা মসজিদ নির্মাণে অংশগ্রহণ করে, তাদের জন্য জান্নাতে বিশেষ পুরস্কারের ঘোষণা রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য একটি মসজিদ নির্মাণ করে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতে একটি ঘর নির্মাণ করেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৪৫০)
একটি মসজিদে যতদিন নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত ও ইবাদত চলবে, ততদিন নির্মাণকারীর সওয়াবও চলতে থাকবে।
২. বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করা
পানি মানুষের মৌলিক প্রয়োজন। তৃষ্ণার্ত মানুষ বা প্রাণীর জন্য পানির ব্যবস্থা করা অন্যতম শ্রেষ্ঠ সদকা। রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, কোন সদকা সবচেয়ে উত্তম? তিনি বলেন, ‘পানি পান করানো।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ১৬৮১)
নলকূপ, গভীর নলকূপ, পানির ট্যাংক বা কূপ খনন করে অসংখ্য মানুষের উপকার করা যায়। যতদিন মানুষ সেই পানি ব্যবহার করবে, ততদিন সওয়াব চলতে থাকবে।
৩. কোরআন ও দ্বীনি জ্ঞান প্রচার
জ্ঞান এমন এক সম্পদ যা মৃত্যুর পরও মানুষের উপকার করে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যারা জানে আর যারা জানে না, তারা কি সমান হতে পারে?’ (সুরা : জুমার, আয়াত : ৯)
কোরআন মাজিদ, হাদিসের বই, ইসলামী সাহিত্য কিংবা দ্বীনি শিক্ষা প্রসারের জন্য অর্থ ব্যয় করা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ কাজ। কেউ সেই জ্ঞান থেকে উপকৃত হলে তার সওয়াব দানকারীর কাছেও পৌঁছায়।
৪. বৃক্ষরোপণ করা
গাছ মানুষের খাদ্য, অক্সিজেন ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে। ইসলামে বৃক্ষরোপণকে সদকা হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কোনো মুসলিম যদি একটি গাছ লাগায়, অতঃপর মানুষ, পাখি বা প্রাণী তা থেকে খায়, তবে তা তার জন্য সদকা হিসেবে গণ্য হয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৩২০)
ফলদ, ঔষধি কিংবা বনজ গাছ রোপণ দীর্ঘমেয়াদি সওয়াবের মাধ্যম হতে পারে।
৫. মাদ্রাসা, স্কুল বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা
শিক্ষা একটি জাতির উন্নতির ভিত্তি। কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা বা পরিচালনায় সহায়তা করা অত্যন্ত মূল্যবান সদকায়ে জারিয়া। যেখানে কোরআন শিক্ষা, দ্বীনি জ্ঞান বা উপকারী শিক্ষা অর্জিত হবে, সেখানে প্রতিটি উপকারের অংশ প্রতিষ্ঠাতার আমলনামায় যুক্ত হতে থাকবে।
৬. হাসপাতাল ও চিকিৎসাসেবায় সহযোগিতা
অসুস্থ মানুষের চিকিৎসা ও সেবায় অংশ নেওয়া ইসলামে মহৎ কাজ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের একটি কষ্ট দূর করে দেয়, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার একটি কষ্ট দূর করে দেবেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৬৯৯)
হাসপাতাল নির্মাণ, অ্যাম্বুলেন্স দান, চিকিৎসা সরঞ্জাম প্রদান কিংবা দরিদ্র রোগীদের চিকিৎসা সহায়তা—সবই সদকায়ে জারিয়ার অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
৭. কবরস্থানের জন্য জমি দান
মুসলমানদের দাফনের জন্য জমি ওয়াকফ বা দান করা একটি গুরুত্বপূর্ণ জনকল্যাণমূলক কাজ। যতদিন সেই জমি মুসলমানদের দাফনের কাজে ব্যবহৃত হবে, ততদিন দানকারীর জন্য সওয়াব অব্যাহত থাকবে ইনশাআল্লাহ।
৮. রাস্তা, সেতু বা মুসাফিরখানা নির্মাণ
মানুষের চলাচল সহজ করার জন্য রাস্তা, সেতু, বিশ্রামাগার বা মুসাফিরখানা নির্মাণ করা সমাজের জন্য বড় উপকার। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা কল্যাণকর কাজ করো, যাতে সফল হতে পারো।’ (সুরা : হাজ্জ, আয়াত : ৭৭)
প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ এসব সুবিধা ব্যবহার করে উপকৃত হয়, আর দানকারীর আমলনামায় সওয়াব জমা হতে থাকে।
৯. খাল, পুকুর বা নদী খনন
কৃষিকাজ, পানীয় জল ও পরিবেশ রক্ষার জন্য খাল, পুকুর বা জলাধার খনন অত্যন্ত উপকারী কাজ। এটি বহু মানুষের জীবনযাত্রাকে সহজ করে এবং দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণ বয়ে আনে। তাই এটিও সদকায়ে জারিয়ার অন্যতম মাধ্যম।
১০. জীবন রক্ষাকারী সহায়তা ও রক্তদান
রক্তদানের মাধ্যমে একজন মানুষের জীবন বাঁচানো সম্ভব। ইসলামে মানুষের জীবন রক্ষা অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ কাজ। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যে একজন মানুষের জীবন রক্ষা করল, সে যেন সমগ্র মানবজাতির জীবন রক্ষা করল।’ (সুরা : মায়িদাহ, আয়াত : ৩২)
যদিও রক্তদান ক্লাসিক অর্থে সবসময় সদকায়ে জারিয়ার উদাহরণ নয়, তবে এটি মহান সদকা ও মানবসেবামূলক কাজ। আর যদি কেউ স্থায়ীভাবে রক্তব্যাংক, চিকিৎসা প্রকল্প বা জীবনরক্ষাকারী ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলেন, তাহলে তা সদকায়ে জারিয়ার অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
এছাড়া আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ সদকায়ে জারিয়া হলো- এতিমখানা প্রতিষ্ঠা করা, হিফজখানা বা কোরআন শিক্ষা কেন্দ্র চালু করা, ইসলামী দাওয়াহ কার্যক্রমে সহায়তা করা, ওয়াকফ সম্পত্তি দান করা, দরিদ্র শিক্ষার্থীদের বৃত্তি প্রদান করা এবং উপকারী ইসলামী বই রচনা ও প্রকাশ করা ইত্যাদি।
