ইসলামের দৃষ্টিতে জীবন একটি নির্দিষ্ট মেয়াদের পরীক্ষা কেন্দ্র। প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর থেকে আমাদের প্রত্যেকের জীবনে এই পরীক্ষা শুরু হয়, মৃত্যুর মাধ্যমে শেষ হয়। এই পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হবে হাশরের ময়দানে। এই যাপিত জীবনের ব্যাপারে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়াতাআলার দরবারে জবাবদিহি করতে হবে। পৃথিবীর জীবনে আল্লাহর দেওয়া সময়, শক্তি, সম্পদসহ সব নেয়ামতের হিসাব দিতে হবে।
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, কেয়ামতের দিন পাঁচটি বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদের আগপর্যন্ত আদম সন্তানের পা আল্লাহর দরবার থেকে একচুলও নড়তে পারবে না:
- ১. তার বয়স সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে, সে তা কী কাজে ব্যয় করেছে?
- ২. তার যৌবন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে, সে তা কী কাজে ক্ষয় করেছে?
- ৩. তার ধন-সম্পদ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে, সে তা কোত্থেকে অর্জন করেছে?
- ৪. ধন-সম্পদ সম্পর্কে আরও জিজ্ঞাসা করা হবে, সে ধন-সম্পদ কোথায় ব্যয় করেছে?
- ৫. অর্জিত জ্ঞান সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে, জ্ঞান অনুযায়ী কী আমল করেছে? (সুনানে তিরমিজি: ২৪১৬)
হাদিসে বর্ণিত এই পাঁচটি প্রশ্ন মূলত প্রতিটি মানুষের জীবনযাত্রার এক সামগ্রিক খতিয়ান। কেয়ামতের বিচারালয়ে পার পেতে হলে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর যথাযথভাবে প্রস্তুত রাখা আবশ্যক।
১. সময়ের মূল্যায়নের গুরুত্ব
জীবন নির্দিষ্ট কিছু মুহূর্ত ও দিনের সমষ্টি। জীবনের প্রতিটি সেকেন্ড আল্লাহর দেওয়া অনন্য নেয়ামত। এই নেয়ামত কি আল্লাহর আনুগত্য, মানবসেবা ও সৎকাজে অতিবাহিত হয়েছে, নাকি অলসতা, আড্ডা, অনর্থক বিনোদন ও পাপাচারের পেছনে শেষ হয়েছে এই প্রশ্ন প্রথম করা হবে। যারা দুনিয়ার জীবনে সময়ের মূল্য দেয়নি, অবহেলায় সময় নষ্ট করেছে, তারা প্রথম প্রশ্নেই আটকে যাবে।
২. যৌবনের শক্তির সঠিক ব্যবহার করতে হবে
যদিও যৌবনকালের সময়টুকু পুরো জীবনের সময়েরই অন্তর্ভুক্ত, তবুও এর বিশেষ গুরুত্বের কারণে আলাদাভাবে যৌবনের হিসাবও চাওয়া হবে। যৌবন জীবনের বসন্তকাল; ইচ্ছা, আবেগ, উদ্যম ও শারীরিক শক্তির সর্বোচ্চ বিকাশ ঘটে এই সময়ে। পাপের প্রলোভন যেমন যৌবনে বেশি থাকে, তেমনি এই বয়সের ইবাদতও আল্লাহর কাছে বেশি মূল্যবান। যৌবনের শক্তিকে কুপ্রবৃত্তি ও পাপাচারের পেছনে ক্ষয় না করে আল্লাহর আনুগত্যে সঁপে দেওয়াই মুমিনের লক্ষ্য হওয়া উচিত।
৩. সম্পদ উপার্জনের পন্থা হালাল হওয়া জরুরি
জীবনে নিজে বেঁচে থাকতে, স্ত্রী-সন্তানদের ফরজ হক আদায় করতে অর্থের প্রয়োজন হয়। প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থ উপার্জনের চেষ্টা করা জরুরি। পাশাপাশি অর্থ উপার্জনের পন্থা হালাল হওয়াও জরুরি। উপার্জন হালাল না হলে ইবাদত কবুল হয় না। হাশরের ময়দানের পাঁচ প্রশ্নের অন্যতম হলো, আপনি কীভাবে সম্পদ উপার্জন করেছেন? হালাল ব্যবসা, সততা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে উপার্জন করেছেন নাকি সুদ, ঘুষ, দুর্নীতি, আত্মসাৎ ও প্রতারণার মাধ্যমে করেছেন? উপার্জিত প্রতিটি মুদ্রার উৎসের স্পষ্ট কৈফিয়ত দিতে হবে।
৪. সম্পদ ব্যয়ও করতে হবে হালাল পথে
সম্পদ কেবল হালাল উপায়ে উপার্জন করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না বরং তা কোথায় এবং কীভাবে খরচ করা হলো সেটির হিসাবও আলাদাভাবে দিতে হবে। অপচয়, অপব্যয়, অহংকার, প্রদর্শনপ্রিয়তা কিংবা কোনো হারাম কাজে সম্পদ ব্যয় হয়েছে কিনা, নাকি জাকাত, সদকা, পরিবারের ভরণ-পোষণ ও জনকল্যাণে ব্যয় করা হয়েছে তা যাচাই করা হবে। হালাল উপার্জনের টাকাও যদি হারাম পথে ব্যয় হয়, তবে তা কঠিন শাস্তির কারণ হবে।
৫. জ্ঞান অনুযায়ী আমল করতে হবে
যৌবনের শক্তি ও ধন-সম্পদের মতো জ্ঞানও আল্লাহর নেয়ামত। এই নেয়ামতের সদ্ব্যবহার করা আমাদের দায়িত্ব। কেউ যদি জ্ঞান লাভ করার পরও জ্ঞান অনুযায়ী আমল না করে, তাহলে তার জ্ঞান কেয়ামতের দিন তার বিরুদ্ধেই দলিল হিসেবে দাঁড়াবে। অজ্ঞ ব্যক্তির ভুল আর জ্ঞান লাভ করা ব্যক্তির ভুল সমান নয়। জ্ঞান লাভ করার সঙ্গে সঙ্গে দায়িত্বও বেড়ে যায়।
