ঋণ পরিশোধ না করে হজ করলে কি হজ হবে?নিজের গ্রামের বাড়িতে গেলে কি কসর পড়তে হবে?ঈদুল ফিতর: নতুন জীবনের উদ্বোধন ১৭ রমজান, ঐতিহাসিক বদর দিবসপবিত্র আল-আকসা মসজিদের ইমাম শেখ মুহাম্মদ আলী আল-আব্বাসি গ্রেপ্তার
No icon

যে পরিস্থিতিতে ইসলামে বদলি হজ করানোর বিধান রয়েছে

বিশ্বের মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় জমায়েতের একটি হজ। ইসলাম ধর্মের পাঁচটি মৌলিক ভিত্তির একটি, যা শারীরিক ও আর্থিকভাবে সামর্থ্যবান প্রতিটি মুসলমানের জন্য ফরজ বা অবশ্য পালনীয় একটি কর্তব্য। যে কারণে হজ পালনে প্রতি বছর বাংলাদেশসহ সারাবিশ্ব থেকে লাখ লাখ মুসলমান হজ পালনে মক্কা নগরীতে সমবেত হন।

ইসলামের পরিভাষায় হজের আভিধানিক অর্থ ইচ্ছা করা ও সফর বা ভ্রমণ করা। অর্থাৎ হজ হলো নির্দিষ্ট সময়ে নির্ধারিত স্থানে বিশেষ কিছু কর্ম সম্পাদন করা।

ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী, আর্থিক ও শারীরিকভাবে সামর্থ্যবান মুসলমানের জীবনে একবার হজ আদায় করা আবশ্যক। তবে অনেক সময় কোন ব্যক্তির ওপর হজ ফরজ হওয়ার পরও অসুস্থতা, বার্ধক্য বা শারীরিক অক্ষমতার কারণে তিনি নিজে হজে যেতে সক্ষম হন না।

সেক্ষেত্রে, তার জন্যও হজ করার বিধান রাখা হয়েছে ইসলামে। ধর্মীয় পরিভাষায় যে হজকে বলা হয়ে থাকে বদলি হজ।

ইসলামবিষয়ক লেখক ও বিশ্লেষক শরীফ মোহাম্মদ বলেন, যে ব্যক্তির আর্থিকভাবে সক্ষমতা আছে, কিন্তু শারীরিক সক্ষমতা নাই বা মৃত্যু পর্যন্ত ছিল না কিংবা থাকার সম্ভাবনাও প্রায় রহিত হয়, তার জন্যই বদলি হজ।

তবে অনেক সময় প্রশ্ন থাকে কারো ওপর যদি হজ ফরজ হয়ে থাকে, তা পালন করার শারীরিক সক্ষমতাও থাকে তাহলে তার ক্ষেত্রে বদলি হজ প্রযোজ্য হবে না।

এক্ষেত্রে বদলি হজ পালনের ক্ষেত্রেও বেশ কিছু বিধি বিধান রয়েছে ইসলামে। যেগুলো অবশ্যই পালন করা উচিত বলে বলছেন ইসলামিক চিন্তাবিদ ও গবেষকরা।

ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী, যিনি বদলি হজ করতে মক্কায় যাবেন তার ক্ষেত্রেও খুব সুনির্দিষ্ট কিছু কিছু নিয়ম রয়েছে।

বদলি হজ কি এবং কেন?

যদি কোনো ব্যক্তি ফরজ হজ্জ আদায় করতে অক্ষম হয় তাহলে তার পক্ষ থেকে দায়িত্ব নিয়ে অন্য কোনো ব্যক্তি হজ্জ পালন করে দিতে পারে। ইসলামের পরিভাষায় এটিকে বদলি হজ বলে।

বদলি হজের মূল লক্ষ্য হলো ওই ব্যক্তির পক্ষ থেকে জিম্মাদারি আদায় করা, যিনি নিজে হজ করার সামর্থ্য হারিয়েছেন।

বাংলাদেশ ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পরিচালক মাওলানা আনিসুজ্জামান শিকদার বলেন, মৃত অবস্থায় ওসিয়ত করে গেলে বা জীবিত অবস্থায় যদি কেউ দেখেন তিনি হজ করতে যেতে পারবেন না তাহলে তার পক্ষ থেকে যে হজ পালন করা হবে সেটিকে ইসলামের পরিভাষায় বদলি হজ বলে।

বদলি হজ কেন করাতে হয়? 

বদলি হজ কেন করাতে হয় তার বিভিন্ন ব্যাখ্যাও রয়েছে ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী। ইসলামি গবেষকরা শরীফ মুহাম্মদ বলছিলেন, ধরুন একজন ব্যক্তির ওপর হজ ফরজ ছিল কিন্তু শারীরিকভাবে সমর্থ থাকতে হজ করেননি। এখন শারীরিক সক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছেন, এখন আপনার পক্ষ থেকে অন্য কাউকে হজ করতে পাঠানো আপনার জন্য ফরজ।

ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী, কোন ব্যক্তির ওপর হজ ফরজ হয়েছিল কিন্তু তিনি হজে যাবার আগেই মারা গেছেন। তাহলে মৃত্যুর পর তার পরিত্যক্ত সম্পদ থেকে তার ওয়ারিশগণ বদলি হজ পালন করতে পারেন।

মাওলানা আনিসুজ্জামান শিকদার বলেন, মারা যাওয়ার আগে যদি কোন ব্যক্তি তার পক্ষ থেকে তার ওয়ারিশগণের কাছে এমন বদলি ওয়াজের বিষয়ে ওসিয়ত করে যান তাহলে তার ক্ষেত্রে বদলি হজ পালন করানো ওয়াজিব।

তিনি আরও বলেন, আর যদি ওসিয়ত নাও করে থাকে যদি তার রেখে যাওয়া সেই পরিমাণ সম্পদ থাকে তার পক্ষে তার সন্তানরা মনে করেন তার পিতা/মাতার নামে বদলি হজ করাতে পারেন। সেটি ওয়াজিব না হলেও উত্তম।

ইসলামি বিধান অনুযায়ী, যে ব্যক্তির সুস্থ হওয়ার আশা আছে বা যিনি নিজে যাওয়ার ক্ষমতা রাখেন, তিনি অন্যকে দিয়ে বদলি হজ করালে তার ফরজ আদায় হবে না।

 

বদলি হজ পালনের নিয়ম কী?

হাদিস ও ইসলামের বিভিন্ন বিধান পর্যালোচনা করে বদলি হজ পালনের ক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিধানের কথা বলছেন ইসলামি লেখক ও গবেষকরা।

সেক্ষেত্রে, কেউ শারীরিকভাবে বেশি অসুস্থ হয়ে পড়লে বা সক্ষমতা হারিয়ে ফেললে এবং তা থেকে মুক্তির কোনো সম্ভাবনা না থাকলে বদলি হজ করানো যায়। দ্বিতীয়ত, জোর করে কাউকে আটকে রাখা হলে, তৃতীয়ত যাওয়ার পথ কারো জন্য অনিরাপদ হলে, চতুর্থত-নারীর ক্ষেত্রে হজে যাওয়ার জন্য মাহরাম পুরুষ সঙ্গে না পেলে তার জন্য বদলি হজ করানো যায়।

শরীফ মুহাম্মদ বলেন, অনেক সময় দেখা যায় কোনো কোনো ব্যক্তি শারীরিকভাবে এতটাই অক্ষম যে তার আর্থিক সামর্থ্য আছে কিন্তু শারীরিক সক্ষমতা নেই তার ক্ষেত্রে বদলি হজ করানো যায়।

তবে, যদি কেউ উল্লিখিত ওজরগুলোর কারণে নিজে জীবিত থাকা অবস্থায় নিজের ফরজ হজ অন্যের মাধ্যমে বদলি হজ হিসেবে করিয়ে ফেলেন, এরপর যদি তিনি আবার শারীরিক সক্ষমতা বা ওইসব সংকট কেটে যায় তাহলে তার পূর্ববর্তী কৃত বদলি হজ বাতিল হয়ে যাবে। এবং পরে তাকে নিজের ফরজ হজ নিজেকেই আদায় করে নিতে হবে।

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পরিচালক আনিসুজ্জামান শিকদার বলেন, যদি মনে করে এখন সুস্থ না আগামী বার সুস্থ হয়ে হজে যেতে পারবে, তাহলে নিজেই করার চেষ্টা করবে। আর যদি কোনভাবেই না হয় তাহলে জীবিত অবস্থায় অন্য কাউকে দিয়ে হজ করিয়ে নিতে হবে।

বদলি হজ করানোর ক্ষেত্রে অনেকে আলেম ওলামা দিয়ে বদলি হজ করিয়ে থাকেন। তবে, এক্ষেত্রে নিজের নিকট আত্নীয় স্বজনের মধ্যে থেকে বদলি হজ করানো উত্তম মনে করেন ধর্মীয় গবেষকরা।

ইসলামের বিধান অনুযায়ী, যার পক্ষ থেকে বদলি হজ করানো হবে তাকেই খরচ বহন করতে হবে। ওই ব্যক্তি যদি মৃত্যুর আগে ওসিয়ত করে যান তাহলে তার রেখে যাওয়া সম্পদ থেকে এই হজ করাতে হবে।

বদলি হজের ক্ষেত্রে একটি আলোচনা নিয়ে দুই ধরনের বক্তব্য আছে ইসলামি গবেষকদের মতে। একটি পক্ষ মনে করেন, যে ব্যক্তি আগে ফরজ হজ আদায় করেননি তাকে দিয়ে বদলি হজ করানো যাবে না।

তবে, ধর্মীয় বিধান পর্যালোচনা করে কেউ কেউ বলছেন, এ বিধানের পক্ষে জোরালো কোন যুক্তি নেই। যে কারণে যে কাউকে দিয়ে বদলি হজ করানো যাবে।

অনেকে প্রশ্ন করে থাকেন, কোনো নারীর পক্ষ থেকে বদলি হজ করাতে হলে অন্য নারী দিয়েই করাতে হবে কি না? তবে ধর্মীয় বিধান পর্যালোচনা করে ইসলামি গবেষকরা বলছেন, বদলি হজের ক্ষেত্রে এমন কোনো আবশ্যকতা নেই। বরং নারীর পক্ষ থেকে পুরুষও বদলি হজ করতে পারবে।

অন্যদিকে ধর্মীয় গবেষকদের মতে, যিনি বদলি হজ করবেন, তাকে সেই দেশের নাগরিক বা বাসিন্দা হতে হবে, যার পক্ষ থেকে তিনি বদলি হজ করছেন।

অবরুদ্ধ বা জেলবন্দির ক্ষেত্রে নিয়ম কী?

প্রতিবছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে লাখ লাখ মানুষ সৌদি আরবে যান হজ পালন করতে। এবছর অন্তত ১৫ লাখ মুসলমানে হজে যাওয়ার কথা রয়েছে।

এর মধ্যে এবার শুধুমাত্র বাংলাদেশ থেকেই হজে যাচ্ছেন ৭৮ লাখেরও বেশি ধর্মপ্রাণ মুসলমান। অনেক সময় বিভিন্ন অপরাধ বা নানা কারণে জেলে আটকা থাকেন অনেকে। অনেকের আবার আমৃত্যু কারাদণ্ড বা আমৃত্যু জেলও দেওয়া হয়। সেক্ষেত্রে অনেকে প্রশ্ন করেন, জেলবন্দি মানুষের ক্ষেত্রে বদলি হজ করানো যাবে কিনা। বদলি হজ পালনের ক্ষেত্রে যেসব নিয়মের কথা বলা হয়েছে, তার মধ্যে একটি হচ্ছে, জোর করে কাউকে আটকে রাখা হলে বদলি হজ করানো যায়।

লেখক ও গবেষক শরীফ মুহাম্মদ বলেন, নিয়ম অনুযায়ী যদি কেউ জেলে থাকে, যদি আমৃত্যু সাজা হয়, উনি যদি বুঝতে পারেন উনি স্বাভাবিকভাবে বের হতে পারবেন না, আমলটা করতে পারবেন না। তখন দেখতে হবে তার ওপর হজ ফরজ হয়েছে কিনা।

তিনি মনে করেন, এক্ষেত্রে যদি তার আর বের হওয়ার কোন সুযোগ না থাকে, তার পক্ষ থেকে পরিবার বদলি হজ করিয়ে নিতে পারেন যদি তার সেই সামর্থ্য থাকে।