আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একবার এক সফরে বের হয়েছেন। সেই সফরে দুই বিশিষ্ট সাহাবি হজরত আবু বকর ও হজরত ওমর (রা.) অন্য আরেকজন সাহাবিকে তাদের খেদমত করার জন্য পারিশ্রমিক বা বেতনের বিনিময়ে সঙ্গে নিয়েছিলেন। একদিন ফজরের নামাজের পর তাদের একজন আরেকজনকে বললেন, সকালে তো নাস্তা করা দরকার, আমাদের খাদেম ভাই কই? তখন অন্যজন জবাব দিলেন, আমাদের খাদেম ভাই তো গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, অর্থাৎ ফজর পড়ে সে ঘুমিয়ে পড়েছে। দ্বিতীয় জন শুনে কিছু বললেন না।কিছুক্ষণ পর যখন খাদেম ঘুম থেকে উঠলেন, তখন তারা তাকে বললেন, তুমি যাও তো দেখি, রাসুলুল্লাহর (সা.) কাছে গিয়ে বলো নাস্তার কী ব্যবস্থা হবে? খাদেম তখন প্রিয়নবীর (সা.) কাছে গিয়ে সালাম দিয়ে বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! অমুক অমুক আমাকে পাঠিয়েছেন, জানতে চেয়েছেন নাস্তার কী ব্যবস্থা হবে? তখন রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাকে বললেন, কেন নাস্তা হবে কেন? যাও, তাদেরকে গিয়ে সালাম দিয়ে বলো, তোমরা তো সকালেই নাস্তা করে ফেলেছ, আবার নাস্তার দরকার কী? খাদেম তখন না বুঝেই ফিরে এসে তাদের বললেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন আপনারা নাকি সকালেই নাস্তা করে ফেলেছেন!
তারা সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারলেন যে নিশ্চয়ই কোথাও কোনো গড়বড় বা মারাত্মক ভুল হয়েছে। তারা তৎক্ষণাৎ আতঙ্কিত হয়ে ছুটে গেলেন প্রিয়নবীর (সা.) দরবারে। গিয়ে বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমরা নাকি নাস্তা করেছি?! তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, হ্যাঁ, তোমাদের ভাই যখন ঘুমিয়ে ছিল, তখন তোমরা তার কাঁচা গোশত খেয়েছ, তোমাদের দাঁতের ফাঁকে এখনো সেই গোশত লেগে রয়েছে! এ কথা শুনে তারা আঁতকে উঠে বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমাদের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান। রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, আমি মাফ চাইলে হবে না; যার গিবত করেছ, তার কাছে গিয়ে ক্ষমা চাও। সে মাফ করলেই কেবল মুক্তি মিলবে।ভেবে দেখুন তো, এমন কথা কি আমরা মাঝে মাঝে বলি না? খুব অনায়াসেই তো আমরা অন্যের দোষ চর্চা করে ফেলি। কিন্তু আমাদের কি একটু হিসাব করা উচিত নয় যে, আমি যে কথাটা বলছি, তা ওই লোকটির কানে গেলে সে কতটা কষ্ট পাবে? এ ধরনের অনর্থক কথাবার্তা না বলে আমরা তো খুব শান্তিতে ও নিরাপদে ভালো থাকতে পারি। এতে কোনো কষ্ট হবে না, ব্যবসায় কোনো লস হবে না, টাকা-পয়সার বরকত নষ্ট হবে না এবং পরিবারে কোনো অশান্তিও তৈরি হবে না। অথচ শুধু শুধু আমরা এই মারাত্মক পাপগুলো নিজেদের কাঁধে তুলে নিই।
আরেকটি ঘটনার কথা স্মরণ করা যাক। একবার রাসুলুল্লাহ (সা.) সফরে যাচ্ছিলেন। যাত্রার সময় নির্ধারিত ছিল, সাহাবিরা সবাই একসঙ্গে রওনা হবেন। সবাই যথাসময়ে উপস্থিত হয়েছেন, কিন্তু দেখা গেল একজন ভাই তখনও এসে পৌঁছাননি। তখন একজন আরেকজনকে বললেন, আমাদের অমুক ভাই কই? উত্তরে আরেকজন মশকরা করে বললেন, আমাদের অমুক ভাইয়ের তো সাজগোজ করতে, একদম পরিপাটি কাপড়চোপড় পরে রেডি হতে একটু দেরিই হয়ে যায়। তারা এই কথাগুলো বলে হাসাহাসি করলেন।রাসুলুল্লাহ (সা.) তখন তাদের কথার কোনো প্রতিবাদ করলেন না। কিছুক্ষণ পর যাত্রা শুরু হলো এবং তারা মরুভূমির ভেতর দিয়ে কিছুদূর এগিয়ে গেলেন। কিছুদূর যাওয়ার পর হঠাৎ দেখা গেল মরুভূমির মধ্যে একটি বন্য গাধা মরে পড়ে আছে। গাধাটির লাশ ফুলে ফেঁপে পা উঁচু করে উল্টে আছে এবং সেটি থেকে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) একটু দাঁড়িয়ে ওই দুজনকে ডাকলেন, যাঁরা একটু আগে অনুপস্থিত ভাইয়ের ব্যাপারে কথা বলেছিলেন। তারা কাছে আসতেই নবীজি (সা.) তাদের বললেন, এই যে মরা গাধাটা পড়ে আছে, এর গোশত খাও! সাহাবিরা আঁতকে উঠে বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! এটা কি কখনো সম্ভব? মরা পচে যাওয় গাধার গোশত কি খাওয়া যায়?
তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, এইমাত্র যাত্রার শুরুতে অনুপস্থিত ভাইয়ের ব্যাপারে তোমরা যে সমালোচনা করছিলে এবং তার অনুপস্থিতিতে যে আপত্তিকর মন্তব্য করেছিলে, তাতে যে পরিমাণ পাপ ও নোংরামি অর্জন করেছ এই মরা গাধার গোশত খেলে তার চেয়ে অনেক কম নোংরামি হবে!এই গিবত বা পরনিন্দা রোগটি কোথা থেকে আসে? এটি মূলত আসে পারস্পরিক শত্রুতা ও বিদ্বেষ থেকে। আপনি যাকে ভালোবাসেন, তার গিবত করতে পারেন না। কাজেই আপনি যখন সকল মুমিনকে ভালোবাসবেন, তখন আপনার মন থেকে অন্য মুমিন ভাইয়ের জন্য দোয়া বের হবে, আহা, আমার মুমিন ভাই যতো গুনাহই করুক না কেন, হে আল্লাহ, তুমি তাকে ক্ষমা করে দাও। এই ভালোবাসা হৃদয়ে ধারণ করলে দেখবেন আপনার মুখ থেকে কারও গিবত বের হবে না।গিবত বড় পাপ যা মরা ভাইয়ের গোশত খাওয়ার সমতুল্য। তবে কিছু বিশেষ প্রয়োজনে মানুষের জীবন বাঁচাতে বা বড় কোনো ক্ষতি রোধ করতে অন্যের দোষের কথা বলার অনুমতি রয়েছে। যেমন কেউ যদি কোনো মেয়ের বিয়ের ব্যাপারে বা কাউকে কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদে চাকরি দেওয়ার আগে পরামর্শ চায়, তখন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মধ্যে কোনো বড় দোষ থাকলে তা সত্যনিষ্ঠভাবে বলা জায়েজ আছে, যাতে অপরপক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
এ রকম প্রয়োজন ছাড়া কারো গোপন দোষ মানুষের সামনে প্রকাশ করবেন না। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি কোনো মুসলমানের গোপন দোষ গোপন রাখে, আল্লাহ তাআলা দুনিয়া ও আখেরাতে তার দোষ গোপন রাখবেন।আমাদেরও অনেক দোষ আছে, ভুলত্রুটি আছে। আপনি যদি না চান দুনিয়ার মানুষ আপনার সব দোষ জেনে ফেলুক, আল্লাহ তাআলা যিনি আপনার সব গোপন অপরাধ ও দুর্বলতা জানেন তিনি আপনার দোষগুলো মানুষের চোখের আড়ালে গোপন করে রাখুন, তবে আপনার দায়িত্ব হলো আল্লাহর অন্য বান্দাদের দোষত্রুটিও গোপন রাখা।তবে যদি এমন কোনো পরিস্থিতি তৈরি হয় যে সেই দোষটি গোপন রাখলে অন্য কারও বড় ধরনের আর্থিক বা সামাজিক ক্ষতি হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে, তবে অন্যকে ক্ষতি থেকে বাঁচানোর স্বার্থে যতটুকু বলা দরকার, ততটুকুই বলবেন। অথবা যার কাছে বললে সেই ব্যক্তি শুধরে যাওয়ার বা সংশোধিত হওয়ার সম্ভাবনা আছে, তাকে শরিয়তের সীমার মধ্যে থেকে জানাবেন। তবুও ঠিক ততটুকুই বলবেন, যতটুকু না বললে নয়।
