মানবসভ্যতার সূতিকাগার এবং প্রথম ইমারত হলো পরিবার। একটি সুস্থ, শান্তিময় ও ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠার মূল শর্ত হলো একটি সুসংগঠিত ও নৈতিকতাসম্পন্ন পারিবারিক কাঠামো। বর্তমান যুগে মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়, দায়িত্বহীনতা, পারস্পরিক আস্থার সংকট এবং পারিবারিক কলহের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে বহু সংসার ভেঙে যায়, বহু সংসার ভাঙতে ভাঙতেও টিকে থাকে, ভেতরে শান্তি থাকে না।পারিবারিক জীবনের এই অবক্ষয় রোধ করে শান্তি, স্থায়িত্ব ও সৌহার্দ্য ফিরিয়ে আনতে ইসলাম দিয়েছে চমৎকার কিছু দিকনির্দেশনা। এই নির্দেশনাগুলো মানলে যে কোনো সংসার সুখের হতে পারে।
১. বৈবাহিক বন্ধনকে আল্লাহর নেয়ামত হিসেবে দেখুন
বৈবাহিক বন্ধন কেবল সামাজিক কোনো চুক্তি বা প্রথা নয়, বরং এটি স্রষ্টার পক্ষ থেকে বান্দার জন্য এক বড় করুণা ও মহা নেয়ামত। তাই এটিকে আল্লাহর নেয়ামত হিসেবে দেখুন এবং সযত্নে আগলে রাখুন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে,
তাঁর নিদর্শনসমূহের মধ্যে একটি হলো, তিনি তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তি পাও এবং তিনি তোমাদের মাঝে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। (সুরা রূম: ২১)
২. স্বামী-স্ত্রী প্রত্যেকেই অপরকে নিজের পরিপূরক বা পূর্ণতা হিসেবে দেখুন
ইসলামে স্বামী-স্ত্রী একে-অপরের অবিচ্ছেদ্য অংশ ও সুরক্ষাবলয়। পবিত্র কোরআনে তাদেরকে পরস্পরের পোশাক বলা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
তারা তোমাদের জন্য পোশাক এবং তোমরা তাদের জন্য পোশাক। (সুরা বাকারা: ১৮৭)
পোশাক যেমন মানুষের শরীর ঢেকে রাখে, শীত-গ্রীষ্ম থেকে রক্ষা করে এবং সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে, তেমনি একজন স্বামী ও স্ত্রী একে অপরের দোষত্রুটি ঢেকে রাখেন, সম্মান রক্ষা করেন এবং জীবনের প্রতিকূলতা থেকে পরস্পরকে সুরক্ষা দেন।
৩. পরস্পরের সঙ্গে উত্তম ও ন্যায় আচরণ করুন
পরিবার পরিচালনার ক্ষেত্রে ন্যায়পরায়ণতা, সহনশীলতা ও সদ্ব্যবহার অপরিহার্য। আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়ে বলেছেন,
তোমরা নারীদের সঙ্গে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো। (সুরা নিসা: ১৯)
প্রিয়নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেছেন,
তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি, যে তার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম। (সুনানে তিরমিজি: ৩৮৯৫)
৪. পরস্পরের ভুল-ত্রুটির ব্যাপারে ধৈর্য ধারণ করুন
মানুষ মাত্রই ভুল করে। দাম্পত্য জীবনে স্বামী-স্ত্রী দুজনেরই বহু ভুল-ত্রুটি হয়ে যাওয়া স্বাভাবিক। স্বামী-স্ত্রী যেহেতু পরস্পরের খুব কাছাকাছি থাকেন, তাই তাদের চোখে পরস্পরের ভুলত্রুটি বেশি ধরা পড়ে। দাম্পত্য জীবন শান্তিপূর্ণ রাখতে পরস্পরের ভুলত্রুটির ব্যাপারে ধৈর্য ধারণ করা জরুরি। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
নিশ্চয়ই ধৈর্যশীলদের তাদের প্রতিদান অগণিতভাবে প্রদান করা হবে। (সুরা জুমার: ১০)
৫. দাম্পত্য জীবনে শান্তির জন্য নিয়মিত দোয়া করুন
দাম্পত্য জীবনে শান্তি আল্লাহ তাআলার বিশেষ অনুগ্রহ। তাই দাম্পত্য জীবনে শান্তির জন্য নিয়মিত দোয়া করা উচিত। পবিত্র কোরআনে রহমানের বান্দাদের যেসব গুণের কথা বলা হয়েছে, তার মধ্যে একটি হলো পারিবারিক জীবনে শান্তির জন্য প্রার্থনা:
رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا বাংলা উচ্চারণ: রাব্বানা হাব লানা মিন আওয়াজিনা ওয়া যুররিয়্যাতিনা কুররাতা আইয়ুনিন ওয়া-জআলনা লিলমুত্তাকীনা ইমামা।
বাংলা অর্থ:< হে আমাদের রব, আপনি আমাদেরকে এমন জীবনসঙ্গী ও সন্তানাদি দান করুন যারা আমাদের চক্ষু শীতল করবে। আর আপনি আমাদেরকে মুত্তাকীদের নেতা বানিয়ে দিন। (সুরা ফুরকান: ৭৪)
আল্লাহ তাআলা আমাদের প্রত্যেককে সুখী পরিবার গড়ার তাওফিক দান করুন, আমিন।
