যে গুণ থাকলে আল্লাহ বান্দাকে ক্ষমা করবেনভারতের প্রাচীনতম মসজিদ চেরুম্যান জুম্মা মসজিদ মুসলমানদের কাছে আল-আকসা বিশ্বের তৃতীয়-পবিত্রতম স্থান আল্লাহর ওপর ভরসা কী?‘কাজা’ নামাজ আদায়ের নিয়ম ও সময়
No icon

বিচ্ছিন্নতায় আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের উপায় 

মহানবী হজরত মুহাম্মদের সা: জীবনে মক্কার অদূরে হেরা পর্বত ছিল ইসলামের প্রথম প্রশিক্ষণকেন্দ্র। অলৌকিক ব্যবস্থাপনায় গড়ে ওঠা এই লৌকিক শিক্ষায়তনে আল্লাহর বিশেষ তত্ত্বাবধানে রাসূল সা: সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। একনিষ্ঠ ধ্যান ও নির্জনতা অবলম্বনের যথার্থ পরিবেশ বিরাজমান ছিল গারে হেরায়। আল্লাহর অদৃশ্য ইশারায় মুহাম্মদ সা:-এর বয়স চল্লিশে পৌঁছার অনেক আগে থেকেই তিনি এখানে নির্দিষ্ট সময় কাটাতে থাকেন। বয়ঃপ্রাপ্তি ও বিয়ের পর থেকে প্রতি বছরই তিনি রমজানের একমাস এখানে নির্জনবাস করতেন। গুহায় অবস্থানকালে মহানবী সা: তাঁর আহূত এবং তাঁর কাছে আগত অসহায় লোকদের খাবার খাওয়াতেন। তখন সাথে থাকতেন তাঁর স্ত্রী খাদিজা রা:; যিনি রাসূল সা:-এর গুহার নিকটবর্তী কোথাও অবস্থান করতেন বা প্রয়োজনে বাড়ি ফিরে আসতেন। ৪০ বছর বয়সে ওহি নাজিলকাল পর্যন্ত তাঁর এ কর্মসাধনা ও কোয়ারেন্টিন অব্যাহত ছিল (সিরাত ইবনে ইসহাক, পৃষ্ঠা-৩৯)। রাসূল সা:-এর পিতামহ আবদুল মুত্তালিবই সর্বপ্রথম এখানে নির্জনবাস করেছেন এবং তিনি এ প্রথার সূচনা করেন। বর্বরতার তিমির পরিবেশে কেউ পাপমুক্তি ও পরিশুদ্ধি অর্জন করতে চাইলে তার সংশোধনাগার ছিল এ গারে হেরা (ইবনে হাজার : ফাতহুল বারি : ১৯/৪৪৯)।
মূলত এখানে নির্জনবাসের কারণ ছিল পাপ বর্জন করা, সব ধরনের অন্যায় থেকে দূরে থাকা, আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টি রহস্য নিয়ে গবেষণা করা ও একত্ববাদের আদর্শের অনুসন্ধান করা। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টিতে, দিন-রাতের আবর্তনে জ্ঞানীদের জন্য নিদর্শন রয়েছে। তাঁরা দাঁড়িয়ে, বসে বা শায়িত অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করে; তাঁরা আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টির রহস্য নিয়ে ধ্যানে (তাফাক্কুর) নিমগ্ন হয় এবং বলে, হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি এসব নিরর্থক সৃষ্টি করনি’ (সূরা আলে-ইমরান, আয়াত : ১৯০-১৯১)। 


মুক্তির পথ লাভে এই গভীর মনোনিবেশ, এই আত্মনিমগ্নতার নির্দেশ কুরআনের একাধিক জায়গায় আল্লাহ দিয়েছেন। এমনকি মহানবী সা:কে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘অতএব যখনই তুমি অবসর পাবে, তখনই কঠোর ইবাদতে নিমগ্ন হও। আর তোমার রবের প্রতি আকৃষ্ট হও’ (সূরা ইনশিরাহ, আয়াত : ৭-৮)। এ রকম গবেষণার ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করে হজরত আবু হুরাইরা রা: থেকে বর্ণিত হাদিসে নবীজী সা: বলেন, ‘সৃষ্টি সম্পর্কে এক ঘণ্টার ধ্যান ৭০ বছর নফল ইবাদতের চেয়ে উত্তম’ (মিশকাত)।


তবে ধ্যান হচ্ছে এমন একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে অস্থির কলব বা মন স্থির ও প্রশান্ত হওয়ার পর মনকে দিয়ে বড় কিছু করানোর প্রস্তুতি নেয়া। ধ্যান মনকে নফস বা প্রবৃত্তির শৃঙ্খলমুক্ত হতে সাহায্য করে এবং তাকওয়াবান হতে সহায়তা করে। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে, মানুষের শতকরা ৭৫ ভাগ রোগ হচ্ছে মনোদৈহিক। এসব রোগে মনের জট খুলতে পারলেই নিরাময় লাভ সম্ভব। এ ক্ষেত্রে বুখারি শরিফের একটি হাদিস বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মহানবী সা: বলেন, ‘শরীরের ভেতর একটি কলব বা মন আছে, তা ভালো থাকলে দেহ ভালো থাকে আর যখন তা খারাপ বা অসুস্থ হয়ে যায়, তখন সারা শরীর খারাপ বা অসুস্থ হয়ে যায়’ (বুখারি, মুসলিম)। 


আমরা জানি স্রষ্টার সাথে ধ্যান নিবেদনের অতি উত্তম সময় হচ্ছে রাতের শেষ প্রহর। কারণ এ সময় প্রকৃতি থাকে নীরব, পরিবার-পরিজনও থাকেন ঘুমিয়ে। তাই খোদাপ্রেমীরা তাহাজ্জুদের মাধ্যমে তাঁকে অনুসন্ধানের মোক্ষম সময় হিসেবে বেছে নেন এই সময়কে। হজরত আবু হুরায়রা রা: থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসূল সা: বলেছেন, ‘আমাদের প্রতিপালক প্রতি রাতে যখন শেষ তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকে তখন প্রথম আসমানে অবতরণ করেন এবং বলতে থাকেন, হে বান্দা! আমার কাছে প্রার্থনা করো, আমি তোমার প্রার্থনা কবুল করবো। আমার কাছে তোমার কী চাওয়ার আছে চাও, আমি তা দান করবো। আমার কাছে তোমার জীবনের গুনাহের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করো, আমি তোমার গুনাহ মাফ করে দেবো’ (বুখারি : ৬৯৮৬)।


পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে বান্দা তাঁর মহান মনিবের সাথে কথোপকথন করেন। তাই প্রতি ওয়াক্ত নামাজ ও ইবাদত শেষে অতিরিক্ত কিছু সময় আমরা আল্লাহর স্মরণে ধ্যানমগ্ন থাকতে পারি। এতে একজন প্রকৃত সাধক ধীরে ধীরে আল্লাহর নৈকট্যে পৌঁছে যেতে সক্ষম হবেন। প্রতিযোগিতার এ বিশ্বে সদা কর্মব্যস্ত মুসলিম সমাজকে কোভিড-১৯ কোয়ারেন্টিনের নামে কিছু বাড়তি সময় ধ্যান ও ইবাদতের মাধ্যমে স্রষ্টার কাছাকাছি যাওয়ার এক অনবদ্য সুযোগ করে দিয়েছে। এ প্রসঙ্গে হজরত আনাস ইবনে মালেক রা: বলেন, মহানবী সা: বর্ণনা করেন আল্লাহ বলেছেন, ‘বান্দা যখন আমার দিকে এক বিঘাত অগ্রসর হয়, আমি তখন তার দিকে একহাত পরিমাণ অগ্রসর হই। আর সে যখন আমার দিকে একহাত পরিমাণ অগ্রসর হয়, আমি তার দিকে দুই হাত পরিমাণ অগ্রসর হই। আর বান্দা যদি আমার দিকে হেঁটে আসে, আমি তার দিকে দৌড়ে যাই’ (বুখারি : ৭০২৮)।


কোয়ারেন্টিনের সময় কুরআন অধ্যয়ন, নফল ইবাদত, সালাত, সিয়াম ও তাহাজ্জুদের মতো উত্তম ইবাদতের মাধ্যমে আমরা স্রষ্টার সান্নিধ্য লাভের চেষ্টা করি। এতে করে করোনা সংক্রমণ যেমন রোধ হবে, তেমনি স্রষ্টার সান্নিধ্যের কারণে করোনাভীতি থেকে আমাদের মনোবল আরো দৃঢ় হবে। আর চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় মনোবল বৃদ্ধির ফলে শরীরের ফায়ার ওয়াল বা রোগ প্রতিরোধের শারীরিক শক্তি বৃদ্ধিতে নিয়ামকের ভূমিকায় কাজ করবে।
লেখক : কো-ফাউন্ডার, কোয়ালিটি এডুকেশন কলেজ ও গবেষক