যাবতীয় প্রশংসা মহান আল্লাহ তাআলার জন্য, যিনি মানবজাতিকে সৃষ্টি করেছেন এবং সন্তানদের ওপর পিতা-মাতার অধিকারকে অতীব গুরুত্বপূর্ণ ও ওয়াজিব হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদের (সা.) ওপর, যিনি পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহারকে জান্নাত লাভের অন্যতম সহজ মাধ্যম হিসেবে উম্মতকে শিক্ষা দিয়েছেন।সন্তানের ওপর পিতা-মাতার হক বা অধিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। ইসলামি শরিয়তে এ অধিকারের গুরুত্ব এতই বেশি যে, মহান আল্লাহ তাআলা তাঁর নিজের ইবাদত ও একাত্ববাদের নির্দেশের পরপরই পিতা-মাতার সঙ্গে সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছেন।পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা বলেন, তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো, তাঁর সঙ্গে কোনো কিছু শরিক করো না এবং পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করো। (সুরা আন-নিসা: ৩৬)
সুতরাং, পিতা-মাতার সঙ্গে উত্তম আচরণ ও সদ্ব্যবহার করা ইসলামের অনুসারীদের ইমানি দায়িত্ব ও কোরআনের সরাসরি নির্দেশ।অন্য আয়াতে মহান আল্লাহ তাআলা বলেন, আর তোমার রব আদেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তাঁকে ছাড়া অন্য কারো ইবাদাত করবে না এবং পিতা-মাতার সঙ্গে সদাচরণ করবে। তাঁদের একজন অথবা উভয়েই যদি তোমার কাছে বার্ধক্যে উপনীত হন, তবে তাঁদের উফ বলো না এবং তাঁদের ধমক দিও না। আর তাঁদের সাথে সম্মানজনক কথা বলো। আর তাঁদের উভয়ের জন্য দয়াপরবশ হয়ে বিনয়ের ডানা নত করে দাও এবং বলো: হে আমার রব! তাঁদের প্রতি দয়া করুন, যেভাবে শৈশবে তাঁরা আমাকে লালন-পালন করেছেন। (সুরা বনি ইসরাইল: ২৩-২৪)
পিতা-মাতা সন্তানের জন্য যে কষ্ট স্বীকার করেন, তার প্রতিদান দেওয়া কোনো সন্তানের পক্ষেই সম্ভব নয়। পিতা-মাতা সন্তানের সুখ-শান্তির জন্য নিজ আগ্রহ থেকেই রাত-দিন পরিশ্রম করেন। জননী চরম কষ্টের পর কষ্ট বরণ করে সন্তানকে গর্ভে ধারণ করেন এবং দীর্ঘ সময় দুধ পান করিয়ে লালন-পালন করেন।আল্লাহ তাআলা বলেন, আমি তো মানুষকে তার পিতা-মায়ের প্রতি সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছি। জননী কষ্টের পর কষ্ট বরণ করে সন্তানকে গর্ভে ধারণ করেন এবং তার স্তন্যপান ছাড়াতে দুই বছর অতিবাহিত হয়। সুতরাং তুমি আমার প্রতি ও তোমার পিতা-মায়ের প্রতি কৃতজ্ঞ হও। (সুরা লোকমান: ১৪)
আল্লাহর রাসুলের (সা.) কাছে আল্লাহর সবচেয়ে প্রিয় আমল সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনিও পিতা-মাতার সেবাকে সালাতের পরেই স্থান দিয়েছেন। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবীজিকে (সা.) জিজ্ঞাসা করলাম, কোন আমল আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয়? তিনি বললেন, যথাযথ সময়ে সালাত আদায় করা। আমি বললাম, তারপর কোনটি? তিনি বললেন, পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করা। আমি বললাম, তারপর কোনটি? তিনি বললেন, আল্লাহর পথে জিহাদ করা। (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)
হযরত ইবনে ওমর (রা.) এক ইয়েমেনি ব্যক্তিকে পিঠে করে তাঁর বৃদ্ধা মাতাকে বহন করে কাবা শরিফ তওয়াফ করতে দেখলেন। লোকটি বলল, হে ইবনে ওমর! আপনি কি মনে করেন যে আমি আমার মায়ের প্রতিদান দিতে পেরেছি? তিনি বললেন, না, তোমাকে প্রসব করার সময় তাঁর দীর্ঘ একটি দীর্ঘশ্বাসের কষ্টের প্রতিদানও তুমি দিতে পারোনি।পিতা-মাতার অবাধ্যতা ও অসন্তুষ্টি অত্যন্ত ভয়াবহ অপরাধ। রাসুলুল্লাহ (সা.) অবাধ্য সন্তানের ব্যাপারে কঠোর সতর্কবার্তা ও অভিশাপ উচ্চারণ করেছেন।হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, সে ব্যক্তির নাক ধূলায় মলিন হোক, সে ব্যক্তির নাক ধূলায় মলিন হোক, সে ব্যক্তির নাক ধূলায় মলিন হোক; যে ব্যক্তি তার পিতা-মাতা উভয়কে কিংবা একজনকে বার্ধক্য অবস্থায় জীবিত পেল, অথচ সে (তাদের সেবা করে) জান্নাতে প্রবেশ করতে পারলো না।’ (সহিহ মুসলিম)
পিতা-মাতা জীবিত থাকলে তাঁদের খিদমত করা, তাঁদের প্রতি দয়া দেখানো, অর্থনৈতিক ও শারীরিক খোঁজ-খবর নেওয়া প্রতিটি সন্তানের ইমানি দায়িত্ব। এমনকি পিতা-মাতার ইন্তেকালের পরও তাঁদের আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছে ইসলাম।হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি তার বাবার সঙ্গে কবরে সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে ভালোবাসে, সে যেন বাবার মৃত্যুর পর তার ভাইদের সাথে সুসম্পর্ক রাখে। (সহিহ ইবনে হিববান)আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে পিতা-মাতার যথাযথ খেদমত করার, তাঁদের মুখে হাসি ফোটানোর এবং তাঁদের আনুগত্যের মাধ্যমে জান্নাত অর্জন করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
