মুমিনের বৈশিষ্ট্য হলো সে যে অঙ্গীকার করবে, তা পূরণ করবেই। কোরআন ও হাদিসে অঙ্গীকার রক্ষার দিকে অত্যাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, হে মুমিনগণ! তোমরা অঙ্গীকারসমূহ পূর্ণ করো। (সুরা মায়েদা: ১) আর রাসুল (সা.) বলেন, যার আমানতদারি নেই, তার ইমান নেই। আর যে অঙ্গীকার পালন করে না, তার দ্বীন নেই। (মুসনাদে আহমদ: ১২৫৬৭) এ কারণে অঙ্গীকার ও চুক্তি পূর্ণ করা ইমানের একটি শাখা।
অঙ্গীকার ও চুক্তি দুই ধরনের
১. আল্লাহর সঙ্গে অঙ্গীকার: ইসলাম গ্রহণের মধ্য দিয়ে মানুষ আল্লাহর সঙ্গে অঙ্গীকার করে। এই অঙ্গীকারের মূল কথা হলো আল্লাহ ও তার রাসুলের (সা.) প্রতিটি আদেশ ও নিষেধ সে মেনে চলবে। এবং সে নিজের ইচ্ছামতো চলবে না।
একইভাবে কোনো ইবাদত শুরু করার পর তা যথাযথভাবে সম্পন্ন করাও আল্লাহর নির্দেশ পালনের অংশ। আল্লাহ তাআলা বলেন, অতঃপর রাত পর্যন্ত রোজা পূর্ণ করো। (সুরা বাকারা: ১৮৭) হজ ও ওমরাহ সম্পর্কে তিনি বলেন, আর আল্লাহর উদ্দেশ্যে হজ ও ওমরাহ পূর্ণ করো। (সুরা বাকারা: ১৯৬)
আল্লাহর কাছে কোনো বৈধ মানত করলে তা পূর্ণ করাও অঙ্গীকার রক্ষার অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ তাআলা নেককার বান্দাদের প্রশংসা করে বলেন, তারা মানত পূর্ণ করে এবং সেদিনকে ভয় করে, যার অনিষ্ট হবে সর্বত্র পরিব্যাপ্ত। (সুরা দাহর: ৭)
অন্যদিকে, যারা আল্লাহর কাছে প্রতিশ্রুতি দিয়ে পরে তা ভঙ্গ করে, তাদের সম্পর্কে তিনি সতর্ক করেছেন। কিছু লোক সম্পদ লাভ করলে সদকা করার অঙ্গীকার করেছিল; কিন্তু আল্লাহ তাদের অনুগ্রহ করার পর তারা কৃপণতা করে এবং প্রতিশ্রুতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। এর পরিণতি সম্পর্কে বলা হয়েছে, তাদের অন্তরে মুনাফেকি গেঁথে দেওয়া হয়েছিল। (সুরা তাওবা: ৭৫ ৭৭)
২. বান্দার সঙ্গে অঙ্গীকার: মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কেও অঙ্গীকার পূর্ণ করা ওয়াজিব। ক্রয়-বিক্রয়ের চুক্তি হলে বিক্রেতার দায়িত্ব পণ্য বুঝিয়ে দেওয়া এবং ক্রেতার দায়িত্ব মূল্য পরিশোধ করা। একইভাবে ঋণ পরিশোধ, শ্রমিকের পারিশ্রমিক দেওয়া, নির্ধারিত সময়ে দায়িত্ব পালন এবং চুক্তির বৈধ শর্তগুলো মেনে চলাও অঙ্গীকার রক্ষার অংশ। আল্লাহ তাআলা বলেন, আর তোমরা আল্লাহর অঙ্গীকার পূর্ণ কর যখন পরস্পর অঙ্গীকার কর এবং তোমরা আল্লাহকে তোমাদের জামিন করে শপথ দৃঢ় করার পর তা ভঙ্গ করো না। নিশ্চয় আল্লাহ জানেন, যা তোমরা কর। (সুরা নাহল: ৯১)
নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করাও এ দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত। কাউকে বৈধভাবে নিরাপত্তা দেওয়া হলে তার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা যাবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন, আর মুশরিকদের মধ্যে কেউ আপনার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করলে আপনি তাকে আশ্রয় দিন; যাতে সে আল্লাহর বাণী শুনতে পায়। তারপর তাকে তার নিরাপদ স্থানে পৌছিয়ে দিন; কারণ তারা এমন এক সম্প্রদায় যারা জানে না। (সুরা তওবা: ৬)
মানুষের সঙ্গে চুক্তি করার অর্থ হলো, তার অধিকার ও প্রাপ্যকে স্বীকার করে নেওয়া। বিক্রেতা পণ্য বুঝিয়ে না দিলে, ঋণগ্রহীতা ঋণ পরিশোধ না করলে কিংবা কাউকে নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিপদে ফেলে দিলে তার অধিকার ক্ষুণ্ন হয়। তাই অঙ্গীকার রক্ষা পারস্পরিক বিশ্বাস, ন্যায়বিচার ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার অন্যতম ভিত্তি।
অঙ্গীকার ভঙ্গের পরিণাম
অঙ্গীকার ভঙ্গের পরিণাম দুনিয়া ও আখেরাত উভয় জাহানেই গুরুতর। এর কারণে একদিকে যেমন মানুষের পারস্পরিক বিশ্বাস নষ্ট হয় ও সামাজিক বন্ধন দুর্বল হয়ে পড়ে, অন্যদিকে কেয়ামতের দিন কঠিন আজাবের মুখোমুখি হতে হবে। আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেন, প্রত্যেক বিশ্বাসঘাতকের জন্য কেয়ামতের দিন একটি পতাকা থাকবে। তার বিশ্বাসঘাতকতার মাত্রা অনুযায়ী সেই পতাকা উঁচু করা হবে। (সহিহ মুসলিম: ১৭৩৮)
অঙ্গীকার রক্ষা মানুষের প্রতি বিশ্বস্ততা এবং আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের পরিচয়। যে ব্যক্তি নিজের কথা ও চুক্তির মর্যাদা রক্ষা করে, সে মানুষের আস্থা অর্জন করে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের পথে এগিয়ে যায়। মুমিনের ইমানের সৌন্দর্য তখনই পূর্ণতা পায়, যখন ব্যক্তির কথা ও কাজের মধ্যে মিল থাকে এবং তার কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি মানুষ নির্ভরতার সঙ্গে গ্রহণ করতে পারে।
